প্রযুক্তির অপব্যবহার সাহিত্যকে ধ্বংসও করতে পারে: হায়দার বসুনিয়া

image-488930-1637302606.jpg

ডেস্ক রিপোর্ট : হায়দার বসুনিয়া নিভৃত পল্লীতে বাস করেও ৫০টি উপন্যাস, ৭টি নাটক ও ৬টি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছেন নিরলসভাবে। ৩০ নভেম্বর ১৯৩৯ সালে জন্ম নেয়া এই লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে ফিরে যান মাটির টানে পৈতৃক নিবাস কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার নাজিম খাঁ ইউনিয়নের মনারকুঠি গ্রামে। পেশা হিসাবে বেছে নেন শিক্ষকতাকে।

আপনাদের শুরুর সময়ের সাহিত্যের পরিবেশ এখনকার পরিবেশে মিলালে কোনো ভিন্নতা চোখে পড়ে? এবং তার ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রভাব?

: আমি ১৯৫৫ সালে লেখালেখি শুরু করেছিলাম। ওই সময় সাহিত্যচর্চার ধরনটা এখনকার পরিবেশ থেকে ভিন্ন ধরনের। সাহিত্য প্রকরণের মধ্যেও কিছুটা ভিন্নতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমার সমকালীন সাহিত্যিকরা অলংকারশাস্ত্রের প্রতি যত্নশীর ছিলেন এবং তাদের সাহিত্যে সার্বজনীন উপজীব্য বিষয়াবলি বিবৃত ছিল। তারা সাহিত্যে মিথ, উপমাসহ নানা ধরনের অলংকার ব্যবহার করতেন কিন্তু এখনকার সাহিত্যিক অলংকারশাস্ত্রের প্রতি ভীষণ উদাসীন। তবুও এখনকার সাহিত্যে আধুনিক বিষয়াবলি উপস্থাপনের মাধ্যমে মানবজীবনে সুখ-দুঃখকে তুলে ধরেন। এখনকার সাহিত্য ব্যাপকভাবে পঠিত। তাদের ভাষা ও ভাব অত্যন্ত সরল ও সাবলিল।

প্রযুক্তির এ পুঁজিবাদী সময়ে একজন কবি তার কবি সত্ত্বাকে কতটা লালন-পালন করতে পারে?

: প্রযুক্তির এ পুঁজিবাদী সময়ে একজন কবি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠেন। সমাজ ও জীবনকে এ পুঁজিবাদী সময়ে একজন কবি নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন না, তাকে নিজের সত্ত্বা থেকে বেরিয়ে এসে নিজের জীবন ও সমাজকে সমন্বয় করতে হয়। ফলে নিজ সত্ত্বার বাইরে এসে তিনি ছলনার আশ্রয়ে নিবিষ্ট হয়ে পাঠককে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে কবিতায় তোষামোদি করেন, ফলে কবিসহ এ প্রযুক্তির এই পুঁজিবাদী সময়ে সংকটময় হয়ে ওঠে।

লেখক হওয়ার জন্য শহরে-কেন্দ্রে চলে আসার প্রবণতাকে কীভাবে দেখেন?

: এই প্রবণতা এখন নয়, আগেও পরিলক্ষিত হয়েছে। সাহিত্যচর্চা শহর ও গ্রমভিত্তিক হওয়া উচিত নয়, সাহিত্য হলো মনকেন্দ্রিক, মন থেকে অনুভূতিগুলো সৃষ্টি হয়। গ্রামেও নিজের অনুভূতিগুলো সাহিত্যে প্রকাশ করা যায়, আবার শহরে বসবাস করেও নিজের অনুভূতিগুলো প্রকাশ করা যায়। শহর ও গ্রামে সাহিত্যচর্চা ও লেখা প্রকাশের অনেক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।

বর্তমানে সাহিত্যে কোন বিষয়গুলো প্রধান্য পাচ্ছে। কোন বিষয়গুলো বেশি প্রাধান্য পাওয়া উচিত?

: বর্তমানে সাহিত্যে দুঃসাহসিক কাজ, দুঃসাহসিক অভিযান উত্তেজনাময় ঘটনা, ও ভূত-কাহিনি লিপিবদ্ধ হচ্ছে, অন্যদিকে মানবজীবনের চির সত্য যেমন : দুঃখ-বেদনা, সুখ-আনন্দ, প্রেম-বিরহ-বেদনাবিষয়ক সাহিত্যচর্চা ক্ষীণ হয়ে আসছে। আমার মতে সাহিত্য জীবন দর্পণ হওয়া উচিত কেননা সাহিত্য জীবনের প্রতিচ্ছবি; নিজের কথা, পরের কথা ও জগতের কথাই হচ্ছে মূল উপজীব্য বিষয় সাহিত্যে।

দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতায় ভালোবাসার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আপনার মূল্যবান

: আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব এমনকি মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা হৃদয়ভিত্তিক হৃদয়জ। কেউ অসুস্থ অথবা বিপদের সম্মুখীন হলে পাড়া- প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনরা দেখতে আসতেন, খোঁজখবর নিতেন। বর্তমানে ভালোবাসা ও ভালোলাগা হচ্ছে দেখা-নেখা ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় আমার মনে হচ্ছে জীবনের প্রথমদিকে যা দেখেছি তা খাঁটি ভালোবাসা সূত্রে গাথা ছিল, এখন যা দেখছি তা হচ্ছে প্রয়োজনে মানুষ প্রিয় হয়ে উঠছে, প্রয়োজনে মানুষ ভালোবাসার কথা বলছে, প্রয়োজন শেষ হলে ভালোবাসা সত্যিকার অর্থে মূল্যহীন হয়ে পড়ে।

আমাদের বর্তমান সাহিত্যে প্রকৃতি মানুষ জীবন কতটা নিজস্ব সৌন্দর্যে বহমান কতটা বিকৃতির শিকার?

: বর্তমানে সাহিত্য মূল্যায়নে পরিলক্ষিত হচ্ছে যে, বেশিরভাগ সাহিত্যে অনবদ্য সত্য উপেক্ষিত। পুরো বিষয়টা সত্য নয়, হয়তোবা উপজীব্য বিষয়টি আংশিক সত্য একজন সাহিত্যিকের জীবন যদি সমাজ, ব্যক্তি ও রাষ্ট্র দ্বারা পরিচালিত হয়, তখন তিনি তার নিজস্ব স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলেন, নিজের সৌন্দর্যে তিনি বিকশিত নন, বরং তিনি বিকৃত মনোভাবে মিথ্যা ও তোষাদামোদির আশ্রয়ে সাহিত্যচর্চা করেন। অনেক সাহিত্যিক নিজের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে এখনো সত্যের উপাসক, অনেকেই আবার প্রভাবিত। তাই তারা বিকৃত।

প্রযুক্তির ব্যবহার সাহিত্যের জন্য কতটা ভালো কতটা মন্দ?

: বিশ্ব আজ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমেই প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে। এটি সত্য যে, প্রযুক্তি ব্যবহার সর্বক্ষেত্রে পরিলক্ষিত। সাহিত্যের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তি ব্যবহার অনিবার্য। দেশ-বিদেশের সাহিত্য সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার চলছে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাহিত্যের জন্য তত্ত্ব-তথ্য সংগ্রহ সহজ হয়ে উঠছে, অন্যদিকে প্লেইডারিজম হচ্ছে। ফলে অন্যের লেখা থেকে বাক্য, ধারণা এমনকি পাতার পর পাতা লিপিবদ্ধ করে নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছেন। মৌলিক লেখাগুলো দূষিত হচ্ছে একদিকে, অন্যদিকে নিজস্ব স্বকীয় হারিয়ে যাচ্ছে। সাহিত্যে প্রযুক্তির ব্যবহার অনিবার্য কিন্তু এটির অপব্যবহার সাহিত্যকে ধ্বংসও করতে পারে।

কুড়িগ্রামের সাহিত্যচর্চার বর্তমান অবস্থা কেমন? কোন কোন দিকে যত্ন নিলে আরও সক্রিয় হতে পারে?

: তুলনামূলকভাবে কুড়িগ্রামের সাহিত্যচর্চা অনেক জেলার থেকে এগিয়ে রয়েছে। বর্তমানে এখানে অসংখ্য সাহিত্যিক সাহিত্যচর্চায় নিমগ্ন। দেশ ও আন্তর্জাতিক মণ্ডলে তাদের লেখাগুলো প্রদর্শিত হলে তা মূল্যায়িত হবে। সাহিত্য সভা, প্রদর্শিত বইমেলা, লাইব্রেরি স্থাপনসহ বই প্রকাশের জন্য আর্থিক সহায়তা পেলে এখানকার সাহিত্য আরও সক্রিয় হবে।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top