সৌদি আরব থেকে শ্রমিক ফেরত, দু’দেশের দালালচক্রের কারণেই বিপদ

Screenshot_2019-10-28-Untitled-11-5db60cbfb5363-webp-WEBP-Image-700-×-400-pixels.png

নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রবর্তন | প্রকাশিতঃ ১০:১২, ২৮ অক্টোবর ২০১৯

সৌদি আরব ও বাংলাদেশের আদম ব্যবসায়ীদের টাকা বানানোর মেশিনে পরিণত হয়েছেন বাংলাদেশি কর্মীরা। ‘ফ্রি ভিসা’র (পছন্দমতো কাজ নেওয়ার সুবিধার ভিসা) নামে কর্মীদের সৌদি পাঠিয়ে তাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে দুই দেশের দালালরা। জনশক্তি খাতের এ অনিয়ম অজানা না হলেও বন্ধে কোনো উদ্যোগ নেই।

জনশক্তি খাত সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, ফেরত আসা কর্মী ও সৌদি আরবে থাকা দূতাবাস কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কীভাবে কর্মী আনা-নেওয়া করে হাজার কোটি টাকা কামাচ্ছে দুই দেশের দালালরা। তারা জানান, সরকার নির্ধারিত ব্যয় এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা হলেও একজন কর্মীকে সৌদি পাঠাতে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত নেয় বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো।

কর্মীপ্রতি এজেন্সির ব্যয় ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা। বাকি টাকা যায় দুই দেশের দালালদের পকেটে। আইনানুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও এজেন্সি ও দালালরা সৌদি থেকে ‘ভিসা কিনে’ কর্মী পাঠায়। একটি ভিসা কিনতে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা দিতে হয় সৌদিতে থাকা চক্রকে।

এই চক্র সৌদির নিয়োগকারীকে (কফিল) টাকা দিয়ে অতিরিক্ত কর্মীর চাহিদা নেয়। কোনো নিয়োগকারীর দু’জন কর্মীর প্রয়োজন হলে তাকে দিয়ে ১০ জনের চাহিদাপত্র নেয়। প্রতিটি চাহিদাপত্রের জন্য বাংলাদেশি টাকায় এক লাখ টাকা দিতে হয়। এ টাকার জন্যই প্রয়োজন না থাকলেও বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয় সৌদি নিয়োগকারীরা।

নিয়োগকারীর চাহিদাপত্রে ভিসা ও কাজের অনুমতি (আকামা) পান বাংলাদেশি কর্মীরা। বাংলাদেশি কর্মী সৌদি আরবে কাজে যোগ দেওয়ার কয়েক মাস পর তাকে তাড়িয়ে দেয় নিয়োগকারী। তার কাছ থেকে যে টাকা নেওয়া হয়, তা থেকেই দু-তিন মাসের বেতন দেওয়া হয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে অত্যাচার, অনিয়মিত বেতনের কারণে কর্মীই কাজ ছেড়ে পালিয়ে যান। এ কারণে ওই কর্মী অবৈধ হয়ে যান। তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। এরপর তার জায়গায় নিয়োগকারী নতুন আরেকজন কর্মী নেয়। তার কাছ থেকেও একই প্রক্রিয়ায় টাকা নেওয়া হয়।

কিছু দিন ধরে সৌদি থেকে কর্মী ফেরতের ঢল নেমেছে। শুক্র ও শনিবার ২৪ ঘণ্টায় দেশে ফিরেছেন ৩৭৩ জন। ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর প্রায় ১৮ হাজার কর্মী দেশে ফিরেছেন। ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, মূলত তিনটি কারণে কর্মীরা ফেরত আসছেন। প্রথম কারণ, কর্মীরা বিদেশ যাওয়ার সময় দালালরা তাদের প্রলোভন দেখায় ফ্রি ভিসায় পাঠানো হচ্ছে। যেখানে ইচ্ছা কাজ করতে পারবে। সৌদি আরবের আইনে যে কফিলের অধীনে কাজের জন্য আকামা হয়েছে, সেখানেই কাজ করতে হবে। কিন্তু কর্মীরা ভালো বেতন কিংবা অত্যাচারের কারণে কর্মস্থল পরিবর্তন করেন। এ কারণে তারা অবৈধ হয়ে পড়েন।

দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশি কর্মীরা যে বেতনে চাকরি নিয়ে সৌদি আরব যান, তা দিয়ে বিদেশ যাওয়ার খরচ তুলতে পারেন না ভিসার মেয়াদে। তাই অনেকে বাড়তি আয়ের আশায় আরেকটি কাজ করতে গিয়ে অবৈধ হয়ে পড়েন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, বৈধ আকামা ও নিয়ম মেনে থাকার পরও অনেককেই ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

শরিফুল হাসান বলেন, প্রথম দুটি কারণে কর্মী ফেরত পাঠানো বন্ধে অভিবাসন ব্যয় কমাতে হবে। ভিসা কেনাবেচা বন্ধ করতে হবে। একজন কর্মী কম টাকায় বিদেশ যেতে পারলে, তিনি খরচ তোলার জন্য কর্মস্থল পরিবর্তন করবেন না। বাড়তি আয়ের জন্য অবৈধভাবে কাজ করবেন না। তৃতীয় কারণ বন্ধে সরকারকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। জানতে হবে, কেন বৈধ কাগজ থাকার পরও কর্মীদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

গত শুক্রবার দেশে ফেরা ৩৭৩ কর্মীর মধ্যে ১৬ জনের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রতিবেদক। তাদের একজন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের সাইফুল ইসলাম জানান, তিনি তিন লাখ ২০ হাজার টাকায় সৌদি আরব গিয়েছিলেন। বাকিরা জানান, চার থেকে ছয় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। তাদের মধ্যে শুধু একজন বলতে পেরেছেন, তিনি কোন রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশ গিয়েছিলেন। বাকিরা জানতেনই না, কোন এজেন্সি, কী কাজ করতে তাদের বিদেশ পাঠিয়েছিল।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব বলেন, বাংলাদেশে বেকারত্বের কারণে অধিকাংশ যুবক বিদেশ যেতে মরিয়া। কিন্তু তারা জানেন না, কী কাজে কোন এজেন্সি তাকে বিদেশ পাঠাচ্ছে। কর্মীদের বিদেশ পাঠানোর আগে যে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা, তা দিতে পারছে না মন্ত্রণালয়। সাত দিনের একটি নামকাওয়াস্তে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাকে ‘দক্ষ’ কর্মী হিসেবে বিদেশ পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু তিনি কিছুই জানেন না। না জেনে, ফ্রি ভিসার প্রলোভনে বাড়ি-জমি বিক্রি করে বিদেশ যান।

গত বছরের নভেম্বরে সৌদি আরব গিয়েছিলেন লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের ফরিদ উদ্দিন। তিনি রিয়াদের একটি দোকানে বিক্রয় কর্মীর চাকরি করতেন। ফরিদ জানান, তার গ্রামের জুয়েল নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে চার লাখ খরচ করে সৌদি আরব যান। কে তার কফিল, তা কোনোদিন দেখেননি। আকামার জন্য প্রতি মাসে ৩০০ রিয়াল (ছয় হাজার টাকা) দিতেন। পুলিশকে দিতেন ২০০ রিয়াল। তার বেতন ছিল দেড় হাজার রিয়াল। ১১ মাসে বাড়ি পাঠান ১০ হাজার রিয়ালের মতো। বিদেশ যাওয়ার খরচের চার লাখের মধ্যে দুই লাখ এখনও তুলতে পারেননি।

ফরিদ জানান, সৌদি গিয়ে জানতে পারেন সৌদি আরবের এক নাগরিককে দেড় লাখ টাকা দিয়ে তার জন্য আকামা জোগাড় করেছিলেন জুয়েল। তারপর মার্ভেলাস ট্র্যাভেলস নামের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে তাকে সৌদি নেওয়া নয়। সৌদির যে নাগরিক তাকে আকামা দিয়েছিলেন, তাকে কোনো দিন দেখেননি ফরিদ। এ অবস্থায় সেখানে ধরা পড়েন তিনি।

লাখ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে গিয়ে কর্মীরা প্রতারিত, নির্যাতিত হয়ে দেশে ফেরত এলেও এতে এজেন্সির দায় দেখেন না রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সংগঠন বায়রার মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান। তিনি বলেন, সৌদির নিয়োগকারী আকামা দেয়, কর্মীর ভিসা হয়, তারপর এজেন্সি কর্মী পাঠায়। কফিলের কর্মী নিয়োগ দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে কি-না তা যাচাইয়ের ক্ষমতা এজেন্সির নেই। এ কাজ সরকারকে করতে হবে। একজন নিয়োগকারীর যতজন কর্মী নিয়োগ দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে, ঠিক ততজন কর্মী পাঠালে ৮০ ভাগ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

তবে বায়রার সাবেক এক সভাপতি বলেন, ভিসা কেনাবেচা নতুন কিছু নয়। তা সরকার, মন্ত্রণালয়সহ সবার জানা। তিনি বছর পাঁচেক আগে সৌদি আরবে কর্মী পাঠিয়েছেন প্রতিটি আকামা তিন লাখ টাকায় কিনে। এই ব্যবসায়ী জানান, বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানিকারকরাই এ অবস্থার সৃষ্টি করেছেন।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, একজন সৌদি নাগরিকের হয়তো বাসাবাড়িতে কিংবা প্রতিষ্ঠানে দু’জন কর্মীর প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা আকামা দেওয়ার জন্য যখন তাকে টাকা দেয়, তখন সে ১০ জন কর্মীর চাহিদা দেখায়। ১০ জন কর্মী নিয়ে, তার টাকা থেকেই তাকে বেতন দেয় কয়েক মাস। তারপর তাড়িয়ে দেয়।

তবে এ অভিযোগ নাকচ করে বায়রার মহাসচিব শামীম বলেন, এ কাজ এজেন্সি নয়, সাধারণ দালালরা করে। যারা আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে বিদেশ যান তারাই মূলত এ ধরনের প্রতারণার শিকার হন। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন বাংলাদেশি সৌদি আরবে যেখানে কাজ করেন সেখানে তিনি নিয়োগকারীকে টাকা দিয়ে কয়েকটি আকামা বের করেন। ওই আকামা দিয়ে আত্মীয়-স্বজন কিংবা গ্রামের প্রতিবেশীদের বিদেশ নিয়ে যান। এর মাধ্যমে তিনি নিজের বিদেশ যাওয়ার খরচ তোলেন। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হন তার মাধ্যমে সৌদি যাওয়া ব্যক্তি। যে এজেন্সি ভিসা প্রসেস করেছে তাকেও এর দায় নিতে হয়।

সৌদি থেকে দেশে কর্মী ফেরতের ব্যাপারে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমদ বলেন, এ দেশে একটি চক্র রয়েছে। তারা বলে, ‘কেনো মতে তিন মাস থাক।’ এরপর আর তাদের দায় নেই। এই চক্রকে ধরতে তদন্ত করার কথা বলেছেন মন্ত্রী।

নারায়ণগঞ্জের সাইফুল ইসলাম গত শুক্রবার ফেরত এসেছেন। গত জানুয়ারিতে তিনি দেশটিতে গিয়েছিলেন। তার গ্রামের দালাল উসমান তাকে বলেছিল, ফ্রি ভিসায়, ভালো বেতনে কাজের সুযোগ রয়েছে। বিদেশ যাওয়ার আগে তিন দিনে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, আঙুলের ছাপ ও ‘প্রশিক্ষণ’ নেন। তাকে কেউ বলেনি, ফ্রি ভিসা বলে কিছু নেই। সাইফুল জানান, সৌদির আল বাহাত এলাকায় এক বাসায় তিনি গাড়ি চালাতেন। তাকে দিনে ২১ ঘণ্টা কাজ করানো হতো। কাজের চাপ সইতে না পেরে তিন মাস পর কাজ ছেড়ে দেন। রিয়াদে মেট্রোরেলের নির্মাণ প্রকল্পে শ্রমিকের কাজ নেন। সেখান থেকে ধরা পড়ার পর তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

সাইফুল জানালেন, সৌদি আরবজুড়ে তার মতোই হাজার হাজার বাংলাদেশি রয়েছেন, যারা কয়েক মাস কাজ করে কফিলের কাছ থেকে পালিয়েছেন। এ ব্যাপারে দূতাবাস থেকেও কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায় না।

গোপালগঞ্জের মোকসেদপুরের সম্রাট শেখ জানান, তিনি বৈধভাবে আড়াই বছর সৌদি ছিলেন। আইন মেনে সরকারি ফি দিয়ে কফিল পরিবর্তন করেছেন। এ ফি কফিলের দেওয়ার কথা থাকলেও, দুই বছরে তিনি ছয় হাজার রিয়াল (এক লাখ ২০ হাজার টাকা) দিয়েছেন। এখনও তার আকামার সাত মাস মেয়াদ রয়েছে। গত ১৬ অক্টোবর নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর তাকে আটক করে জেলে নেয় পুলিশ। সেখানে বাংলাদেশ দূতাবাসের এক কর্মকর্তা এসেছিলেন। সম্রাট তার পা জড়িয়ে ধরেন। কর্মকর্তা জবাব দেন, আল্লাহর কাছে বিচার দেওয়া ছাড়া কিছু করার নেই তাদের। আইন অনুযায়ী কফিল তাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার কথা। কিন্তু ফোন না থাকায় ও দূতাবাসের সহযোগিতা না পাওয়ায় কফিলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি তিনি।

এ অভিযোগের জবাবে সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ বলেন, রিয়াদ, জেদ্দা ও দাম্মাম জেল পরিদর্শনের অনুমতি রয়েছে দূতাবাসের কর্মকর্তাদের। সৌদি আরবে ২২ লাখ বাংলাদেশি রয়েছেন। কিন্তু দূতাবাসের সব মিলিয়ে জনবল মাত্র ৭২ জন। শ্রম উইংয়ে রয়েছে ১৬ জন। এত কম জনবল দিয়ে কর্মীদের সব অভিযোগ শোনা ও নিষ্পত্তি করা যায় না।

রাষ্ট্রদূত জানান, বাংলাদেশি কর্মীদের দেশে পাঠানোর অভিযোগ পেলে সৌদি সরকারের কাছ থেকে জবাব নেওয়া হয়। সৌদি সরকার ভিডিও ও ছবিসহ দূতাবাসকে প্রমাণ দিয়েছে যে, দেশে পাঠানো কর্মীরা ভিক্ষাবৃত্তি ও হকারের কাজ করছে। তখন বাংলাদেশের কিছু করার থাকে না।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top