আল্লাহ নামের মাহাত্ম্য

Screenshot_2020-10-06-আল্লাহ-নামের-মাহাত্ম্য.png

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন,

وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا 

‘আল্লাহ তায়ালার সুন্দর সুন্দর নাম আছে। তাই সুন্দর নাম দ্বারা তাকে ডাকো।’ (সূরা: আল আরাফ, আয়াত: ১৮০)।

আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের একটি সত্তাগত নাম আল্লাহ, অন্যগুলো সিফাতি নাম। এ নামকে মাহাত্ম্যসম্পন্ন এবং নামসমূহের সাইয়েদও বলা হয়, নিরানব্বই সিফাতি নাম, যা কোরআন মাজিদে বর্ণিত এবং হাদিসে এ ছাড়াও কিছু নাম আছে। তাই আল্লাহ তায়ালার গুণাবলীর কোনো পরিসীমা নেই। এজন্য তার গুণসম্পন্ন নামেরও কোনো সীমা নেই।

এজন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দোয়া চাইতেন। হে আল্লাহ! আমি তোমার ওই নামসমূহের মাধ্যম দোয়া চাই। যার জ্ঞান তুমি স্বীয় রাসূলদের দিয়েছ। অথবা নিজের ফেরেশতাদের দিয়েছ বা যার জ্ঞান তুমি কাউকে দাওনি। শুধু তুমিই বিদ্যমান আছ। হে আল্লাহ! আমি তোমার ওই নামসমূহের মাধ্যমে তোমার নিকট দোয়া চাইছি। এতে বোঝা গেল, আল্লাহ তায়ালার সিফাতি বা গুণবাচক নামের কোনো সীমা নেই।

কোরআন মাজিদের সারনির্যাস:

আল্লাহ শব্দটি কোরআন মাজিদের সারনির্যাস। একটি ইলমি সূতা মনে রাখবেন। কোরআন মাজিদের সূরাগুলো তিন প্রকার। সূরা মুজাদালার প্রত্যেকটি আয়াতের মাঝে আল্লাহ তায়ালার নাম এসেছে। দ্বিতীয় ওইসব সূরা যাতে দ্বিতীয় তৃতীয় আয়াতে আল্লাহর নাম এসেছে। যেমন সূরা আর রহমান। এ সূরার প্রতি দুই তিন আয়াত পরেই ফাবি আইয়্যি আলা রাব্বিকুমা তুকাযযিবান এ আয়াতে এসেছে। রব শব্দ বারবার এসেছে। এটাও আল্লাহর নাম।

তাছাড়া অবশিষ্ট সূরাগুলোতেও যদি চিন্তা করা হয় তাহলেও প্রতি পাঁচ সাত আয়াত পর পর আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের নাম এসেছে। আল্লাহ শব্দ কোরআন মাজিদে ছয়শত আটানব্বই বার ব্যবহৃত হয়েছে। তাছাড়া একবার আউযুবিল্লাহ এবং একবার বিসমিল্লাহ। যদি এ দু’টিকেও গণনা করা হয় তাহলে সাতশত বার হবে। আর রহমান এবং আর রহিমের শব্দও বেশ কয়েকবার ব্যবহৃত হয়েছে। অবশ্য রব শব্দ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে।

বেশ কয়েক আয়াতের পরেই আপনি রব শব্দ পাবেন। এটি অনুভূত হয় যে, আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত তার নামকে ইচ্ছাকৃতভাবে বারবার এনেছেন। যেন আমার বান্দাদের জবানে আমার নাম বারবার বের হয়। অথচ কয়েক স্থানে আয়াতের নমুনা বলতে চায় যে, কথাটা অন্যভাবেও হতে পারত। কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত এমন পদ্ধতিতে তার নাম এতে এনেছেন। উদাহরণত আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَيَسْتَعْجِلُونَكَ بِالْعَذَابِ 

‘এবং ওই লোকেরা আজাবকে দ্রুত করতে চান।’ (সূরা: হজ্জ, আয়াত: ৪৭)।

এবং তার এ উত্তর দেয়া হয়েছে যে, আজাব দ্রুতই আসবে। কিন্তু বললেন,

وَيَسْتَعْجِلُونَكَ بِالْعَذَابِ وَلَنْ يُخْلِفَ اللَّهُ وَعْدَهُ 

‘তারা দ্রুত আজাব আসার কামনা করছে এবং আল্লাহ কখনো স্বীয় অঙ্গীকারের বিপরীত করবেন না। (সূরা: হজ্জ, আয়াত: ৪৭)।

এখানে আল্লাহ শব্দটি এনেছেন অথচ এই শব্দ এখানে আনার প্রয়োজন ছিল না।

অন্যত্র ইরশাদ করেছেন,

ذَلِكَ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيكُمْ

‘তাহলো যা তারা নিজের হস্তার্জিত আমল পূর্বে পাঠিয়েছে।’ (সূরা: আলে ইমরান, আয়াত: ১৮২)।

নিয়ম তো বলে যে, তারা জাহান্নামে যাবে। কিন্তু জবাব দেয়া হলো,

ذَلِكَ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيكُمْ وَأَنَّ اللَّهَ لَيْسَ بِظَلَّامٍ لِلْعَبِيدِ

‘এই লো যা তোমাদের হাত দ্বারা পূর্বে কামাই করেছ এবং নিঃসন্দেহে আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের প্রতি জুলুমকারী নন।’ (সূরা: আনফাল, আয়াত: ১৫)।

আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত এখানেও তার পবিত্র নাম শামিল করে ছিল। অন্যত্র বলেন,

وَاتَّبِعْ مَا يُوحَى إِلَيْكَ وَاصْبِرْ حَتَّى يَحْكُمَ اللَّهُ 

‘এবং আপনি তার অনুসরণ করুন যা আপনার প্রতি ওহির মাধ্যমে প্রদান করা হয়েছে এবং ধৈর্যধারণ করুন এমনকি আল্লাহ তায়ালা মীমাংসা করে দেবে।’ (সূরা: ইউনুস, আয়াত: ১০৯)।

এ আয়াতে চিন্তা করলে বুঝা যায় যে, স্বর্ণকার যেমনভাবে স্বর্ণের নকশা তৈরি করে তাতে অলংকারের সৌন্দর্য বেড়ে যায়। এভাবে আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত স্বীয় কালামকে নিজ নামের নকশা দ্বারা অলংকৃত করে দিয়েছেন।

উলামারা এখানে একটি গূঢ় তত্ত লিখেছেন। তারা বলেছেন, যদি কোনো ব্যক্তি কোরআন মাজিদে এর অনুবাদের কিছুই বুঝে না। কিন্তু সে কোরআন মাজিদ তেলাওয়াত করে। যেহেতু তার মুখ থেকে বারবার আল্লাহ শব্দ বের হয় এজন্য কিছু পৃষ্ঠা পাঠের পর জবান থেকে এত অসংখ্য বার আল্লাহর নাম বের হয়ে যায় যাতে জিকির করার উপকার নসিব হয়েই যায়।

হজরত মুরশিদে আলম (রহ.) বলতেন, কোরআন মাজিদকে কচলিয়ে ফেলে অর্থাৎ নিংড়ানো হলে এক ফোঁটা বের হবে তা হলো আল্লাহ। অর্থাৎ আল্লাহ শব্দ গোটা কোরআন মাজিদের নিংড়ানো সারনির্যাস এবং সারমর্ম।

দুই মারেফার ধারণকারী নাম:

এটি আশ্চর্যের কথা। আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের নামের শুরুতে আলিফ-লাম। এটি নির্দিষ্টের জন্য ব্যবহৃত হয়। আরবিতে নিয়ম আছে কনোন শব্দকে নির্দিষ্টকরণের জন্য আর পূর্বে আলিফ-লাম লাগানো হয়। যে শব্দে আলিফ-লাম লাগানো থাকে। তার ওপর আহ্বানসূচক শব্দ ইয়া সঠিকভাবে প্রবেশ করতে পারে না। কারণ হলো আলিফ-লামও নির্দিষ্টকরণের জন্য এবং ইয়াও নির্দিষ্টকরণের জন্য আসে। গোটা আরবি ভাষায় শুধু আল্লাহ শব্দটি এমন যাতে আলিফ-লামও আছে এবং ইয়াও আসতে পারে। আল্লাহ নামের মাঝে দু’টি মারেফার ধারণক্ষমতা আছে।

নুকতাবিহীন নাম তাওহিদের পয়গাম:

আল্লাহ তায়ালা নিজের জন্য এমন নিখুঁত নাম পছন্দ করেছেন। ওই নামের কোনো অক্ষরে নুকতা নেই। এজন্য তাওহিদ চায় যে, নামে যদি নুকতা এসে যায় তাহলে শিরককারী ব্যক্তিও কোনো বৈধতা অনুসন্ধান করবে। এ জন্য বলে দিয়েছে যে, তাঁর সত্তা ও গুণাবলীতে শিরকের সংশ্লিষ্টতার সুযোগ নেই। আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের তোমরা কোনো কমতি বের করতে পারবে না এবং কাউকে তার সত্তায় শরিক করতে পারবে না। তিনি সব প্রকার দোষমুক্ত এবং অংশীবাদ থেকে উর্ধ্বে।

সব ইঙ্গিত আল্লাহর প্রতি:

আল্লাহ এমন নাম। যদি এ নামের অক্ষরগুলোকে পৃথক পৃথক করতে চান তাহলেও অবশিষ্ট নাম ওই দিকেই ইঙ্গিত করে। উদাহরণত আল্লাহ শব্দের ইঙ্গিত আল্লাহ পাকের প্রতি। যদি প্রথমের আলিফ ফেলে দেয়া হয় তাহলে বাকি অক্ষরকে কিভাবে পড়বে? লিল্লাহ পড়বে তার ইঙ্গিতও আল্লাহরই প্রতি। আল্লাহ বলেন,

وَلِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ 

‘আল্লাহর জন্যই যা আছে আসমানে এবং জমিনে। (সূরা: আলে ইমরান, আয়াত: ১০৯)। আয়াতের শুরু অংশে আল্লাহ শব্দ থেকে আলিফ ফেলে দেয়া হয়েছে। তারপরও আল্লাহর দিকেই ফিরছে।

যদি প্রথম লামও সরিয়ে দেয়া হয় তাহলে বাকি লাহু থাকবে। তার ইঙ্গিত ও আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের দিকে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,

لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ 

‘তাঁরই জন্য যা আসমানে এবং জমিনে আছে।’ (সূরা: বাকারা,  আয়াত: ১১৬)।

যদি দ্বিতীয় লামও সরিয়ে ফেলা হয় তাহলে অবশিষ্ট থাকে ‘هُ’ তার ইঙ্গিতও আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের দিকে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,

لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ 

‘তিনি ব্যতিত কোনো মাবুদ নেই।’ (সূরা: হাশর, আয়াত: ২২)।

ওই প্রতিপালকের প্রতি উৎসর্গ প্রাণ যিনি তাঁর সত্তাগত নামও তাই পছন্দ করেছেন যদি কেউ ওই নামের অক্ষরগুলোকে পৃথক করে টুকরা টুকরাও করে ফেলে তবু প্রতিটি টুকরা আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের প্রতি ইঙ্গিত করবে।

ঈমানের পরিপূর্ণতা:

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

تبارك اسم ربك

‘বরকতওয়ালা নাম তোমার প্রভুর।’ (সূরা: আর রাহমান, আয়াত: ৭৮)।

আল্লাহ তায়ালা নিজেই বলছেন যে, এটি বরকতওয়ালা নাম। এ নামের কারণেই আমাদের ঈমান নসিব হয়। উলামারা লিখেন, যদি কোনো ব্যক্তি এ শব্দগুলো পড়ে,

لا إله إلا الرئوف محمد رسول الله
لا إله إلا الرحيم محمد رسول الله
لا إله إلا الرحمن محمد رسول الله

তাহলে সে মুসলমান হয় না। কেননা, গুণান্বিত নামতো অন্যদের জন্যও ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন سميع এবং بصير এর জন্যও ব্যবহৃত হতে পারে। যতক্ষণ সে لا إله إلا الله محمد رسول الله  না বলবে, সত্তাগত নাম না নেবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার ঈমান পূর্ণ হবে না।

দূরত্ব নিঃশেষকারী নাম:

এটি এমন বরকতওয়ালা নাম যেখানে তা এসে যায় সেখানে দূরত্ব কমে যায় এবং নিকটে এসে যায়। উদাহরণস্বরূপ এক বেগানা মেয়ে ছিল। শরীয়ত বলে তার দিকে দেখা হারাম। তার সঙ্গে একাকি বসা হারাম। কিন্তু যখন সে মেয়েকে বিয়ের মাধ্যমে গ্রহণ করে, তখন নিজের সব আপনজনদের চেয়ে বড় আপন হয়ে যায়। এমনকি তাকে জীবনসঙ্গীনী বলা হয়।

আজিমুশশান কোরআন বলেছে,

هُنَّ لِبَاسٌ لَكُمْ وَأَنْتُمْ لِبَاسٌ لَهُنَّ 

‘তারা পরিধানের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক।’ (সূরা: বাকারা, আয়াত: ১৮৭)।

একটু চিন্তা করে দেখুন, দেহের সবচেয়ে নিকটবর্তী হলো মানুষের পোশাক। যেমন বলা হলো, স্বামীর সবচেয়ে নিকটবর্তী একান্ত আপন হলো স্ত্রী। স্ত্রীর প্রিয় হলো স্বামী। এক প্রাণ দুই মন। দেহ দু’টি এবং উভয়টির প্রাণ এক।

এত ঘনিষ্ঠ ভালোবাসার সম্পর্ক কিভাবে হলো? আল্লাহর নামের বরকতের কারণে। কোরআন বলেছে,

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالاً كَثِيرًا وَنِسَاء وَاتَّقُواْ اللّهَ الَّذِي تَسَاءلُونَ بِهِ وَالأَرْحَامَ إِنَّ اللّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا

‘হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গীনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দু’জন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট প্রশ্ন করে থাক এবং আত্নীয় জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন।’ (সূরা: নিসা, আয়াত: ০১)।

তাসাউল কাকে বলে? এমন বরকতবিশিষ্ট সত্তা যে সত্তার বরকতে আমরা পরস্পর আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন করি। যদি তাঁর নাম মাঝে না আসত তাহলে বিয়েও শুদ্ধ হত না। কত বরকতওয়ালা নাম, যা মাঝে এসে গেলে যত দূরত্ব আছে তা দূর হয়ে যায়। অচেনা লোকেরা পরস্পর আপন বানিয়ে দেয়। শুধু তাই নয় বরং যার দিকে দেখা নিষিদ্ধ ছিল, তার দিকে দেখা সওয়াবের কাজ হয়ে থাকে।
সত্তাগত নামের বরকত

এ নাম বরকতে পূর্ণ কিন্তু সত্য কথা হলো আমরা এসব বরকত সম্পর্কে অবগত নই। কারণ আমরা তো কখনো পরীক্ষাই করিনি। যদি কখনো এমন লোকদের নিকট বসে পড়ি, যারা এ নামের বরকতের জানাশোনায় অবগত। সে আমাদের নিকট তার পরিচিতি প্রকাশ করবে ওই নামের মাঝে কী বরকত আছে।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: নিরাপত্তা সতর্কতা!!!