খুলনায় শব্দ দূষণের সর্বোচ্চ মাত্রা ১৩২ ডেসিবেল : হুমকিতে জনস্বাস্থ্য

1-6-BG20170615161356.jpg

স্টাফ রিপোর্টার, খুলনা : খুলনা মহানগরী এলাকায় কর্মরত ট্রাফিক পুলিশের ৫ শতাংশ একবারেই কানে শোনেননা। আর ৩৫ ভাগ সদস্য কানের সমস্যাসহ নানা ধরনের শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। শব্দ দূষণের কারণে বধিরতা ছাড়াও হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, গর্ভবর্তী নারীদের জটিলতা ও মানসিক সমস্যা বাড়ছে।

জনস্বাস্থ্যের জন্য শব্দের নিরাপদ মাত্রা ৪৫ ডেসিবেল। পরিবেশ অধিদপ্তরের এক জরিপে খুলনা মহানগর এলাকায় সর্বোচ্চ ১৩২ ডেসিবেল মাত্রার শব্দ দূষণ পাওয়া গেছে। গবেষণা থেকে শব্দ দূষণের কারণ হিসেবে যানবাহনের উচ্চশব্দ ও হাইড্রোলিক হর্ণ ব্যবহার, নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির শব্দকে প্রধানত: দায়ি করা হয়েছে। এছাড়া শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতির শব্দ, মাইক ও সাউন্ড বক্সের আওয়াজ এবং বিভিন্ন ইস্যুতে পটকা বা আতশবাজির ব্যবহার দূষণের মাত্রাকে চরমে পৌঁছে দিচ্ছে।

শনিবার খুলনায় পরিবেশ অধিদপ্তর আয়োজিত এক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সকালে নগরীর অফিসার্স ক্লাবে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও অংশীদারীত্বমূলক প্রকল্পের আওতায় সচেতনতামূলক এ কর্মসূচিতে শতাধিক পরিবহন চালক-শ্রমিক অংশ নেন।
খুলনা জেলা প্রশাসক মো: মনিরুজ্জামান তালুকদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (যুগ্ম সচিব) ও প্রকল্প পরিচালক মো: হুমায়ুন কবির। বিশেষ অতিথি ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মামুনুর রশিদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) বিমল কৃষ্ণ মল্লিক, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ কমিশনার (ট্রাফিক) মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক, কান, গলা বিভাগের প্রধান ডা: মো: কামরুজ্জামান ও পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনার বিভাগীয় পরিচালক সাইফুর রহমান খান।

প্রকল্প পরিচালনক মো: হুমায়ুন কবির বলেন, করোনা অতিমারী গত দেড় বছরে আমাদের যে ক্ষতি করেছে তার চেয়ে অন্তত ১০ গুণ বেশি ক্ষতি করছে নীরব ঘাতক শব্দ দূষণ। দূষণ নিয়ন্ত্রণে আমাদের দেশে কঠোর আইন আছে, কিন্ত আইন না মানার প্রবণতার কারণে সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। উন্নত দেশে ৯০ ভাগ মানুষ আইন মানে, বাকি ১০ ভাগ মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশকে কাজ করতে হয়। আর আমাদের দেশে ঘটে উল্টোটা। গুরুত্বহীন কাজে সময় নষ্ট করায় গুরুত্বপূর্ণ কাজে আমরা পিছিয়ে পড়ছি। ২০৪০ সালে উন্নত দেশে উন্নীত হতে হলে আচরণগত ও অভ্যাসগত পরিবর্তন আনতে হবে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মামুনুর রশিদ বলেন, খুলনা থেকে যশোর ৬০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে এক ঘন্টা লাগার কথা। কিন্ত দুই লেনের রাস্তা, নানা গতির যানবাহন চলে। রাস্তায় বাঁক আছে, হাট বাজার বসে। না চাইলেও চালকদের হর্ণ দিতে হয়। এক ঘন্টার জায়গায় দুই ঘন্টা সময় লাগে পৌঁছাতে। মটরযান আইনে অনিয়মের কঠোর শাস্তি আছে। তবে শুধু আইন প্রয়োগ করে সমাধান সম্ভব না।

ট্রাফিক পুলিশের পাঁচ ভাগ সদস্য একেবারে কানে শোনেন না আর ৩৫ ভাগ সদস্য ভুগছেন নানা সমস্যায়। এ তথ্য জানিয়ে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ কমিশনার (ট্রাফিক) মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, সিগন্যালে এক মিনিট আটকা পড়লেই আমরা অধৈর্য্য হয়ে হর্ণ বাজাতে শুরু করি। আমাদের দেশে শব্দ দূষণের মাত্রা ১২০ ডেসিবেলের ওপরে। তিনি যানবাহন থেকে হাইড্রোলিক হর্ণ খুলে ফেলার আহবান জানান।

খুলনায় প্রতি মাসে গড়ে ট্রাফিক আইনে আড়াই হাজারের ওপর মামলা হচ্ছে। তারপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেনা সড়ক ব্যবস্থাপনায়। এ তথ্য জানিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) বিমল কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, অনেক মালিক অল্প বেতনে অপেশাদার চালকের হাতে গাড়ি তুলে দেন। ফলে শব্দ দূষণের সাথে সাথে দূর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।

খুমেক হাসপাতালের নাক, কান, গলা বিভাগের প্রধান ডা: মো: কামরুজ্জামান বলেন, শব্দ ও পরিবেশ দূষণ রোধ করতে না পারলে জনসংখ্যার বড় একটি অংশ বধির হয়ে যাবে। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়বে। মেজাজ বাড়বে, অনিয়ন্ত্রিত আচরণ করবে। কাজে মনসংযোগ হারাবে। কর্মক্ষমতা কমবে, স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় বাড়বে।

সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনার বিভাগীয় পরিচালক সাইফুর রহমান খান বলেন, আমরা এখন ওয়ান টাইম জেনারেশনে পরিণত হয়েছি। আমাদের গ্লাস, প্লেট, বোতল সবকিছুই ওয়ান টাইম। খালি হাতে বাজারে চলে যাই, পলিথিনে ভরে বাজার নিয়ে আসি। দায় একা পরিবেশ অধিদপ্তরের নয়। সমাজের সবার দায়িত্ব আছে জীবনকে নিরাপদ করার।

সভাপতির বক্তব্যে খুলনা জেলা প্রশাসক মো: মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেন, আমাদের শপথ নিতে হবে বিনা প্রয়োজনে হর্ণ দেবোনা। বিশেষ করে হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস আদালত ও আবাসিক এলাকায়। এসময় শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আইনসমূহ, সড়ক পরিবহন আইন এর বিভিন্ন ধারা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।

পরিবহন চালক শ্রমিকদের পক্ষে হারুন অর রশিদ ও আলী আহমেদ বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন।

প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে জানানো হয়, দেশের ১১ টি সিটি কর্পোরেশন ‘নীরব এলাকা‘ ঘোষণা ও বাস্তবায়নে কাজ করেছে। খুলনা মহানগরের ২১ নং ওয়ার্ডের কেডি ঘোষ রোড, রতন সেন সরণি, ভৈরব স্ট্র্যান্ড রোড, ২২ নং ওয়ার্ডের যশোর রোড, পুরাতন যশোর রোড, কেডি ঘোষ রোডের সংযোগ ও আপার যশোর রোড নীরব এলাকার আওতাভূক্ত।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top