শিক্ষায় আমূল পরিবর্তন

image-464750-1631562654.jpg

ডেস্ক রিপোর্ট : এসএসসির আগে আর কোনো পাবলিক পরীক্ষা হবে না। আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা থাকবে না তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত। আগামী বছর সর্বশেষ পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা হবে। এরপর থেকে আর নয়। শুধু দশম শ্রেণির লেখাপড়ার ওপর হবে এসএসসি পরীক্ষা।

নবম-দশম শ্রেণিতে এখনকার মতো বিজ্ঞান, মানবিক ও বিজনেস স্টাডিজ নামে আলাদা কোনো বিভাগ থাকবে না। জীবনের উদ্দেশ্য ঠিক করে শিক্ষার্থীরা এইচএসসিতে বিভাগভিত্তিক লেখাপড়া করবে। এইচএসসি পরীক্ষা হবে দুবার।

প্রথমবার একাদশ শ্রেণিতে, শেষবার দ্বাদশ শ্রেণিতে। দুটি পরীক্ষাই বোর্ডের অধীনে হবে। দুই পরীক্ষার নম্বর যোগ করে হবে চূড়ান্ত ফল। বর্তমান সময়ের তুলনায় অর্ধেক নম্বরে এসএসসি পরীক্ষা হবে। প্রতি বিষয়ে ৫০ নম্বরের পরীক্ষা স্কুলেই হবে।

বাকি ৫০ নম্বরের পরীক্ষা নেবে শিক্ষা বোর্ড। এইচএসসিতে ৩০ শতাংশ নম্বরের ওপরে কলেজ মূল্যায়ন করবে। বাকি ৭০ শতাংশের ওপর হবে বোর্ড পরীক্ষা। উভয় স্তরের পাবলিক পরীক্ষায় বিষয় সংখ্যা বর্তমানের চেয়ে অর্ধেক হয়ে যাবে।

বাকি বিষয়গুলোর মূল্যায়ন হবে কলেজে। ২০২৫ সালের এসএসসি এবং ২০২৬ ও ২০২৭ সালের এইচএসসি প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব পরীক্ষা হবে নতুন পাঠ্যক্রমে।

নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখায় এসব নীতি প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সোমবার এটি অনুমোদন করেন। তার কাছে রূপরেখার খুঁটিনাটি উপস্থাপন করা হয়েছিল।

এটি দেখে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও বিশ্বপরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে শিক্ষাব্যবস্থা আরও আধুনিকায়ন করতে হবে। শিক্ষা কার্যক্রম যুগোপযোগী করা একান্তভাবে অপরিহার্য।

সোমবার বিকালে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি ২০২৩ সাল থেকেই এটি বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। এর আগে আগামী জানুয়ারি থেকে পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন (পাইলটিং) শুরু হবে।

তিনি বলেন, ধাপে ধাপে ২০২৭ সালের মধ্যে রূপরেখার আলোকে তৈরি শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন শেষ হবে। এর মধ্যে নতুন পদ্ধতিতে এসএসসি পরীক্ষা ২০২৫ সালে আর এইচএসসিতে ২০২৬ সাল থেকে নেওয়া শুরু হবে।

তিনি বলেন, ২০২৩ সাল থেকে পঞ্চম শ্রেণির পিইসি এবং অষ্টম শ্রেণির জেএসসি ও সমমান পরীক্ষা থাকবে না। সাময়িক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ষষ্ঠ শ্রেণিতে উন্নীত করা হবে। তবে এই দুই স্তরে মেধাবৃত্তি কীভাবে দেওয়া হবে সে বিষয়টি এখনো নির্ধারিত হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতে শিক্ষাব্যবস্থা একাধিকবার পরিমার্জন হয়েছে। কিন্তু এবার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এম. তারিক আহসান  বলেন, এই রূপরেখা শিক্ষাব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে।

পুরোনো মুখস্থনির্ভর লেখাপড়া ও জ্ঞান পরিমাপের চর্চা থেকে শিক্ষার্থীরা বের হয়ে আসবে। তাদের মাঝে জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির আন্তঃসম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে যোগ্যতার উন্নয়ন ঘটানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে। দেশে একমুখী ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা চালুর স্বপ্ন প্রায় ৬৭ বছরের।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে বঙ্গবন্ধু এই শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলেছিলেন। ১৯৭২ সালে তার গঠিত কুদরত-ই-খুদা কমিশনের রিপোর্টেও একই প্রস্তাব ছিল। সেটা এখন বাস্তবায়িত হচ্ছে। অধ্যাপক আহসান নতুন এই রূপরেখা প্রণয়ন কমিটির বিশেষজ্ঞ সদস্য।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বছর রূপরেখার আলোকে প্রাথমিক স্তরে প্রথম এবং মাধ্যমিক স্তরে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পাইলটিং শুরু হবে। এ লক্ষ্যে বর্তমানে শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই তৈরির কাজ চলছে।

২০২৩ সালে এই দুই শ্রেণি এবং দ্বিতীয় ও সপ্তম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হবে। ২০২৪ সালে তৃতীয় ও চতুর্থ এবং অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রমের পাঠ্যবই চালু হবে।

২০২৫ সালে পঞ্চম এবং দশম শ্রেণিতে যাবে নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে লেখা পাঠ্যবই। এই বছরই এসএসসি পরীক্ষা হবে নতুন রূপরেখার আলোকে। অর্থাৎ বর্তমানে নবম-দশম শ্রেণি মিলিয়ে এসএসসি পরীক্ষা হলেও ২০২৫ সালে কেবল দশম শ্রেণির (এক বছরের পাঠ) বইয়ের ওপরই হবে এই পরীক্ষা।

এই ব্যাচটি যখন একাদশ শ্রেণিতে যাবে অর্থাৎ ২০২৬ সালে নতুন শিক্ষাক্রমে বই পড়বে। একইভাবে তারা ২০২৭ সালেও নতুন বই পাবে। বর্তমানে এইচএসসি পরীক্ষা দুই বছরের লেখাপড়ার ওপরে হয়।

কিন্তু ইংরেজি মাধ্যমের ‘এ’ লেভেলের মতো প্রতিবছরের পড়ার ওপরে তারা বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নেবে। ফলে এইচএসসি পরীক্ষা হবে দুটি। এই পরিকল্পনা তৈরিতে নেতৃত্ব দেন জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সদস্য অধ্যাপক মশিউজ্জামান।

তিনি বলেন, এই রূপরেখা শিখন কার্যক্রম ক্লাসরুমের নির্দিষ্ট ছকের সঙ্গে বাস্তবজীবনের অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণের কথা বলেছে। এতে শেখা বা জ্ঞানার্জন আরও আনন্দদায়ক হবে।

অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা বিষয়জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান, নেতৃত্ব ইত্যাদি গুণাবলি ও দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে বিশ্ব নাগরিক হয়ে উঠবে। অপরদিকে শিখনের মূল্যায়ন শুধু শিক্ষক, লিখিত ও পাবলিক পরীক্ষানির্ভর থাকবে না। এ ক্ষেত্রেও মৌলিক পরিবর্তন আসবে।

রূপরেখার লক্ষ্য : মৌলিক ও ডিজিটাল সাক্ষরতা, সৃজনশীল ও সুক্ষ্মচিন্তা, সমস্যা সমাধান, স্ব-ব্যবস্থাপনাসহ ১১টি দক্ষতা অর্জন মূল লক্ষ্য। পাঁচ ধরনের জ্ঞান শিক্ষার্থীকে দেওয়া হবে।

সেগুলো হচ্ছে-পাঠ্যবই, আন্তঃবিষয়, বিষয়ভিত্তিক বিশেষ জ্ঞান ও পদ্ধতিগত জ্ঞান। উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশপ্রেম, সম্প্রীতিসহ ৬ ধরনের মূল্যবোধ জাগ্রত এবং আত্মবিশ্বাসসহ তিন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি। সবমিলে দশটি যোগ্যতা অর্জন করবে।

কীভাবে পাইলটিং : আগামী বছর (২০২২) প্রাথমিকে প্রথম শ্রেণি এবং মাধ্যমিকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পাইলটিং করা হবে। এজন্য প্রাথমিকে ১০০টি এবং মাধ্যমিকের ১০০টি স্কুল বেছে নেওয়া হবে।

ছয় মাস পাইলটিংয়ের পর স্কুলগুলো থেকে মতামত (ফিডব্যাক) এনে তা বিশ্লেষণ করে ২০২৩ সালে চারটি শ্রেণির জন্য তৈরি করা নতুন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই।

শিখন ক্ষেত্র : প্রাক-প্রাথমিক থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ১০ ধরনের শিখনক্ষেত্র ঠিক করা হয়েছে। এগুলো হলো-ভাষা ও যোগাযোগ, গণিত ও যুক্তি, জীবন ও জীবিকা, সমাজ ও বিশ্ব নাগরিকত্ব, পরিবেশ ও জলবায়ু, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, সুরক্ষা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি।

পরীক্ষার চেয়ে ক্লাসে মূল্যায়নে গুরুত্ব : সব ধরনের শিখন মূল্যায়নের ভিত্তি হচ্ছে যোগ্যতা। অর্থাৎ শিক্ষার্থী শিখেছে কিনা সেটা সামনে রেখে মূল্যায়ন করা হবে। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা নেওয়া হবে না।

শিক্ষকের মূল্যায়নের মাধ্যমে পরের শ্রেণিতে পদোন্নতি দেওয়া হবে শিক্ষার্থীদের। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে ৬০ শতাংশই শিক্ষক সারাবছর ধরে মূল্যায়ন করে নম্বর দেবেন। বাকি ৪০ শতাংশ নম্বরের ওপর ৫ বিষয়ে (বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান) পরীক্ষা হবে।

ধর্মশিক্ষাসহ বাকি বিষয়গুলোতে শতভাগই শিক্ষক মূল্যায়ন করবেন। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে উল্লিখিত ৫ বিষয়ে ক্লাসেই ৬০ শতাংশ এবং ৪০ শতাংশ আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা। আর এসএসসি পর্যন্ত ওই ৫ বিষয়েই ৫০ শতাংশই শ্রেণিকক্ষে মূল্যায়ন, বাকি আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা।

এসএসসির আগে হবে না কোনো পাবলিক পরীক্ষা, ২০২৩ সাল থেকে পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিল করা হবে। উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির কাজে ৩০ শতাংশ নম্বর দেবেন শিক্ষক। বাকি ৭০ শতাংশের ওপরে ৭ বিষয়ে বোর্ড পরীক্ষা হবে।

২০২৫ সালের এসএসসি এবং ২০২৬ ও ২০২৭ সালের এইচএসসি প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব পরীক্ষা হবে নতুন পাঠ্যক্রমে।

যেসব বিষয়ের পাঠ্য থাকছে : প্রাক-প্রাথমিকের শিশুদের জন্য পাঠ্যবই থাকবে না। শিক্ষকদের দেওয়া ‘শিক্ষকগাইড’র নির্দেশনা অনুযায়ী তারা শেখাবেন। প্রাথমিকের জন্য আটটি বিষয় নির্বাচন করা হয়েছে।

এগুলো হলো-বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, ধর্মশিক্ষা, ভালো থাকা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি। এর মধ্যে ‘ভালো থাকা’ এবং ‘শিল্প ও সংস্কৃতি’ বিষয়ে আলাদা বই থাকবে না।

ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে ১০টি অভিন্ন বই পড়াতে হবে। এগুলো হলো-বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, জীবন ও জীবিকা, ডিজিটালপ্রযুক্তি, ধর্মশিক্ষা, ভালো থাকা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি। এগুলোর মধ্যে প্রথম ৫টিতে পরীক্ষা হবে।

কর্মঘণ্টা : তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের স্কুলে বছরে ৬৮৪ ঘণ্টা পাঠদান করা হবে। চতুর্থ-পঞ্চমে ৮৫৫ ঘণ্টা, ষষ্ঠ-অষ্টমে ১০৫০ এবং নবম-দশমে ১১১৭ ঘণ্টা ৩০ মিনিট করে পড়ানো হবে।

একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুমে থাকবে ১১৬৭ ঘণ্টা ৩০ মিনিট। দিনের হিসাবে মাধ্যমিকে ১৮৫ দিন পড়ানো হবে। ইউরোপের দেশগুলোতে ১৮১ দিন স্কুলে যেতে হয়।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top