বুস্টার ডোজের জন্য আমেরিকা যাওয়ার প্রশ্নই আসে না: মিশা সওদাগর

113137sou.jpg

ডেস্ক রিপোর্ট :  ‘সুরক্ষায় থাকুন, সুস্থ থাকুন’ স্লোগানে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে লাইভ অনুষ্ঠান হয়েছে। গতকাল রবিবার সন্ধ্যা ৭টায় অনুষ্ঠানটি শুরু হয়ে প্রায় এক ঘণ্টা ২৭ মিনিট ধরে চলে।  ‘সুরক্ষায় থাকুন, সুস্থ থাকুন’ শিরোনামের এ অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন  চলচ্চিত্র অভিনেতা ও বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির মিশা সওদাগর এবং সঞ্চালনা করেছেন সহকারী ফিচার সম্পাদক দাউদ হোসাইন রনি। অনুষ্ঠানটি স্পন্সর করেছে হাইজিনেক্স।

বাংলা চলচ্চিত্রের অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন খল অভিনেতা মিশা সওদাগর। তিনি রেকর্ড সংখ্যক আট শতাধিক ছবিতে ভিলেন হিসেবে অভিনয় করেছেন। এত সংখ্যক ছবিতে ঢালিউডের আর কোনো অভিনেতাই অভিনয় করেননি। অভিনয় প্রতিভা দিয়ে দুইবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও জিতেছেন মিশা।

১৯৬৬ সালের ৪ জুন গুণী এই অভিনেতার জন্ম হয়েছিল পুরান ঢাকায়। সেখানেই বেড়ে ওঠা। এ অভিনেতার প্রকৃত নাম শাহীদ হাসান। তার বাবার নাম ওসমান গনি এবং মায়ের নাম বিলকিস রাশিদা। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে মিশা চতুর্থ। প্রতাপশালী এই অভিনেতা বাংলা চলচ্চিত্রে এসেছিলেন ১৯৮৬ সালে বিএফডিসি কর্তৃক আয়োজিত নতুন মুখ কার্যক্রমে নির্বাচিত হয়ে। ১৯৯০ সালে ছটকু আহমেদ পরিচালিত ‘চেতনা’ ও ‘অমরসঙ্গী’ চলচ্চিত্র দুটিতে তিনি প্রথমে নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন। কিন্তু সাফল্য পাননি। যার কারণে সে সময়কার পরিচালকরা তাকে খলচরিত্রে অভিনয়ের পরামর্শ দেন। মিশা তাই করেন। বাকিটা তো ইতিহাস। বর্তমানে তিনি খল চরিত্রে অপ্রতিরোধ্য।

চলচ্চিত্রের পাশাপাশি মিশা কয়েকটি নাটকেও অভিনয় করেছেন। এছাড়া তাকে দেখা গেছে ছোটপর্দার সঞ্চালক হিসেবেও। অভিনেতা পরিচয়ের বাইরে মিশা একজন শিল্পী নেতাও। ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনে তিনি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি একই সমিতির টানা দুইবারের সভাপতি। অভিনয়ের পাশাপাশি কাজ করে চলেছেন শিল্পীদের কল্যাণেও।

সুদূর আমেরিকা থেকে যোগ দিয়েছেন মিশা সওদাগর। মিশা ভাই, কেমন আছেন?

মিশা সওদাগর: ভালো আছি। ডালাসে আছি, আমার ছেলে পড়ে টেক্সাস স্টেট ইউনিভার্সিটিতে। ছেলেকে দেখতে আসতে হয়; ছোট ছেলে সেভেন-এইটে পড়ে। মূলত ছেলের জন্য আসা; ভালো আছি।

করোনাভাইরাস মহামারির এই সময়ে আসলে কতটা ভালো থাকা যায়?

মিশা সওদাগর: এটা আসলে পারফেক্ট কথা। বিশেষ করে আমরা যারা শোবিজে কাজ করি, সবাই জানে যে, শোবিজের লোকদের উপরেরটা মানুষ দেখে, ভেতরেরটা আমরা কাউকে বোঝাতে পারি না। মানে আমরা যারা শোবিজে কাজ করি, শিল্প-সংস্কৃতির সাথে যারা জড়িত; আমি মনে করি- যেসব দর্শক আমাদের সম্মান করেন, তারাও আমাদের সঙ্গে জড়িত। মূলত আমাদের কাজ তো বন্ধ।

ওই হিসেবে আছি আলহামদুলিল্লাহ। সব সময় আসলে উপরওয়ালার শুকর গুজার করতে হয়। কারণ, উনি এখনো আমাদের করোনায় আক্রান্ত করেননি। আমাদের পরিবারের কাউকে উনি এখনো করোনায় আক্রান্ত করেননি, এটাকে অনেক বড় দয়া বলবো আমি।

আপনারা যে নিজেদের সুরক্ষিত রাখছেন, কিভাবে রাখছেন? একটু যদি বলেন, আমাদের দর্শক-পাঠকরাও জানতে পারবে যে, মিশা সওদাগর নিজেকে ও তার পরিবারকে কিভাবে সুরক্ষিত রাখছেন করোনা মহামারি থেকে?

মিশা সওদাগর: আসলে আমেরিকায় আসি, এটা শুধু ছেলের জন্য। আমেরিকায় কন্ট্রোল করতে পারি না, এটা কন্ট্রোলের বাইরে। এখন স্বাস্থ্য বিষয়ক অধিদপ্তর, দেশের বলি বা হু (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংষ্থা) বলি, তারা যে টিপসগুলো দিয়েছে- মাস্ক পরতেই হবে, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, হ্যান্ড সানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে, এটাতো সবাই পারবে না আমাদের দেশে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে, দূরত্ব বজায় রাখতে হবে; এগুলোই চেষ্টা করি। কিন্তু কেন জানি মনে হয় ভাগ্যও একটা ব্যাপার।

শোবিজে শুধু কোয়ালিটি থাকলেই এগিয়ে আসা যায় না, অনেক সময় ভাগ্য অনেককে অনেকদূর এগিয়ে নেয়। কম কম মেধাসম্পন্ন শিল্পী স্টার, সুপারস্টার, মেগাস্টার হয়ে যায়।  আবার অনেক ফাইন টিউন একজন আর্টিস্ট তার জায়গায় যেতে পারেন না। এ কারণে বলি- এটা ভাগ্যেরও একটা ব্যাপার। অনেকে হয়তোবা মাইন্ড করতে পারে, তাতে কিছু যায় আসে না।

আমি বাঙালি এবং আমি মুসলমান। আমি ঈমান এনেছি এবং ঈমানের একটি অংশ হলো- আমাকে ভাগ্য বিশ্বাস করতে হবে। ওই জায়গা থেকে আমাকে বিশ্বাস করতে হবে, আমেরিকা পারেনি, ইন্ডিয়া পারেনি; কিন্তু বাংলাদেশ কত তাড়াতাড়ি ইনজেকশন সবাইকে দিয়েছে এবং কন্ট্রোলও তাড়াতাড়ি হয়েছে। আমাদের যে অবস্থায় চলাফেরা, আমাদের যে সংস্কৃতি- আমাদের তো মহামারি হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, লাশ পড়ে থাকার কথা ছিল বিভিন্ন জায়গায়। সে অবস্থা কিন্তু হয়নি। সেটা কি ভাগ্য বলবো না? এটা আমার মত; সেটা উপরওয়ালার সহায়তা, আমাদের চেষ্টা এবং ভাগ্য; সবমিলিয়ে এটাই আর কি। এবার আপনি আমেরিকায় গেছেন, পত্রিকার খবরে এসেছে আপনি বুস্টার ডোজ নেওয়ার জন্য গেছেন। আবার শোনা যাচ্ছে, আপনি পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য গেছেন, আসলে বিষয়টা কী?

মিশা সওদাগর: আমার গ্রিন কার্ড আছে। আমার বড় ছেলে ইউনিভার্সিটিতে পড়ে, সেকেন্ড ইয়ার শেষ করে থার্ড ইয়ারে উঠেছে, আমার ছোট ছেলে সেভেন-এইটে এখানে পড়ছে। আমি যতবার আমেরিকায় আসি, ইউটিউব নামে যে আইটেমটা এখন সুপারহিট, এরা আমাকে জিজ্ঞেসও করে না। আমি কিছুদিন আগে শুনলাম, এখানে আসার আগে; সময় টিভির রাজিব কোনো একটা কারণে ফোন দিয়েছে, শুধু তাকে বলেছি- দেখ আমি একটু বাইরে। কোথায় বাইরে, সেটা কিন্তু কাউকেই বলিনি ওইভাবে। শুধু বলেছি শরীরটা ভালো না, ছেলেকে দেখতে যাবো। বুস্টার ডোজের জন্য আমেরিকা যাওয়ার তো প্রশ্নই আসে না।

ফার্মেসীতে গেলে রেজিস্ট্রেশন করিয়ে সাথেসাথে এমনিই দিয়ে দেয়। আমাকে জিজ্ঞেস করল, বয়স কত? কখন টিকা দিয়েছি? বললাম, গত মার্চে দিয়েছি। তারা বলল, আমি বুস্টার ডোজ নিতে পারবো। তারপর আমি দরখাস্ত পূরণ করে নিয়ে নিলাম। এই আর কি। আর কিছু না।

অনেক ধরনের খবর অনেক রকমভাবে পাওয়া যাচ্ছে। আপনার কাছ থেকে আসল কথাটা জানা গেল। আপনি যে দুইটা ছবিতে নায়ক হয়েছিলেন, একটি ছটকু আহমেদের আরেকটি আলমগীর কুমকুমের। এই দুই ছবি সম্পর্কে দর্শকরা একটু কম জানে বলে মনে হয়। ওই দুই ছবিতে কী কী বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে এবং পারিপার্শ্বিক ঝামেলা পোহাতে হয়েছে সে সময়?

মিশা সওদাগর: আমি কিন্তু তথ্য মন্ত্রণালয়ের সৃষ্টি। নতুন মুখের সন্ধানে’র মাধ্যমে এসেছি। আমাদের ব্যাচ ছিল ৮৬। আমি, অমিত হাসান, শাহিন আলম এই তিনজন। আমরা যখন চেতনা ছবি করতে গেলাম; আমরা সিলেক্ট হওয়ার পর আবার রিহার্সেল করতে হয়েছে। ছটকু আহমেদ ছিলেন ডিরেক্টর। প্রডিউসর ছিলেন উনার বোনের হাজবেন্ড। এটাই প্রথম ছবিতে চান্স পাই। চান্স পাওয়ার পর যখন শুটিং করছি, তখন আমাদের কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হতো না। এমনকি আমাদের কোনো খরচও দেওয়া হতো না।

তখন আমাদের মাথায় ছিল যে, অভিনয় করবো, মানুষ ফিল্মে আমাদের দেখবে এবং আমরা অভিনয় করছি, এটাই আমাদের কাছে অনেক বড় পাওয়া ছিল। তারপর সপ্তাহখানেক শুটিং করার পরে আমি, অমিত হাসান, খালিদ মুহাম্মদ; সবাই মিলে প্রডিউসারের কাছে গেলাম। উনাকে আমরা দুলাভাই ডাকি। বললাম- দুলাভাই এটা কোনো কথা হলো নাকি; আমরা সবাই ইয়াং ম্যান, আপনার শালা, আমাদের হাত খরচ দেয় না। অন্যান্য আর্টিস্টদের দেয়, আমাদের দেয় না। কারণ, তখনো আমরা আর্টিস্ট হিসেবে পরিগণিতই হইনি, কোনো গ্রেডেই পড়ি না। তার পর মনে আছে, আমাদের ৫০ টাকা করে দেওয়া হলো। বললো- হিরোদের ৫০ টাকা করে দাও।

চেতনা ছবিতে আমার চরিত্র ছিল যে, আমি হিন্দু ধর্মাবলম্বী থাকি। আমার নাম থাকে মিশা। আমার একটা গানও হয়। সেখানে একটা ব্যাপার ছিল- লাশ কিভাবে  পোড়ানো হবে, তখন রেহানা জলি আপা যে প্রধান চরিত্রে ছিলেন আলমগীর ভাইয়ের … উনি বলেন যে, মিশার কেউ নেই আমি জ্বালাবো। সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে একটা ফিলকে ধরার চেষ্টা ছিল ছটকু আহমেদের।

আমরা সবাই মিলে খুব ভালো কাজ করেছিলাম। এই ছবির একটা এক্সপেরিয়েন্স; আমাদের তো প্রথম জীবনের অভিনয়, শ্রদ্ধীয় এটিএম শামসুজ্জামান ছিলেন আমার কো-আর্টিস্ট। তখন তো শট বুঝি না। ওএস, ওভার শোল্ডার শট। উনার পেছন থেকে যখন শট নিচ্ছে, আমি যখন ডেলিভারি দিচ্ছি উনাকে, উনি যে রিঅ্যাকশন করছেন, আমি যতবার মনিটর দিই ওকে, টেক দিতে গেলেই এনজি। কোনোভা্ই হয় না। আমি নিজের টেম্পারেচার ধরে রাখতে পারি না। উনি যখন চোখের এক্সপ্রেশন দিচ্ছেন, রিঅ্যাক্ট করছেন, তাতে আমার অ্যাক্ট শেষ।

ছয়-সাতটা টেক হয়ে যাওয়ার পরে বললেন- বুঝতে পারছি বুঝতে পারছি। বললেন, মিশা একটা কাজ করো বাবা। উনি আমাকে ছেলে বলতেন। বাবা তুমি একটা কাজ করো মিশা, তুমি আমার ভ্রুর দিকে তাকাও, চোখের দিকে তাকাইও না। ওদিকে ক্যামেরা আছে, বোঝা যাবে না। উনি আমাকে এই টিপস দিলেন। কারণ, উনার চোখের দিকে তাকালে মনে হয়, হারিয়ে যাই। উনার রিঅ্যাকশনেই আমার অ্যাকশন চেঞ্জ হয়ে যায়; জিরো। তারপর উনার চোখের দিকে না তাকিয়ে একটু উপরে ভ্রুর দিকে তাকালাম কপালের দিকে; ক্যামেরার ওই দিক থেকে তো আর বোঝা যায় না, আধা ইঞ্চি পার্থক্য। অবশেষে আট নম্বর টেক ওকে হয়ে গেল। শিখলাম তার কাছে। উনার চোখের দিকে তাকিয়ে যেহেতু প্রবলেম হচ্ছে, ভ্রুর দিকে তাকালে অসুবিধা হবে না।

আলমগীর কুমকুমের ছবিতে কাজ করছিলাম, খায়ের ভাই ছিলেন। বড় দুজন নায়ক ছিলেন উনার ছবিতে। জসিম ভাই, আলমগীর ভাই। আর আমরা চারজন ছোট নায়ক ছিলাম। ইমরান ভাই, আমি, অমিত হাসান আর শিখর ভাই। খব সুন্দর গল্প ছিল। সেখানকার একটা পার্টে আমাদের জীবন এসেছিল। তখন আমরা গান গাই, হইচই করি, মেসে থাকি এরকম একটা ব্যাপার। আমি নাচতে পারতাম আর কি।

নতুন মুখের ডিমান্ড ছিল- নায়কদের নাচতে হবে, ফাইট করতে হবে, ক্যারাটে করতে হবে। এগুলো মোটামুটি সবগুলো করেই ঢুকসিলাম। নাচ শেষ করলাম। বাবু ভাই ছিলেন ড্যান্স ডিরেক্টর। আমার রিদমটা খুব ভালো ছিল। খায়ের ভাই বললেন, এই ছেলেটা খুব ভালো নাচে তো, এরে আরো একটু সামনে আনো।

তখন ইমরান ভাই একটু ফোকাসড আর কি। ইমরান ভাই দু-চারটা ছবি করেছেন। ইমরান ভাই বলল- মিশারে একদম সামনে আনো। আমি আর অমিত একটু পিছনে ছিলাম। আমাকে আনার ব্যাপারে ইমরান ভাই একটু আগ্রহী ছিল। শিখর ভাই, অমিত একটু পিছনে ছিল। আমার ব্যাপারে বলা হল- ওকে সামনে আনো। ও তো দারুণ এক্সপ্রেশন দেয়।

কুমকুম ভাইও কখনো বকা দিতেন না। আমরা যে নতুন, আমরা শট বুঝি, না-বুঝি; আমরা বড়বড় আর্টিস্টদের সাথে কাজ করছিলাম, আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে। আলমগীর ভাইয়ের সাথে কাজ করবো, জসিম ভাইয়ের সাথে কাজ করবো, সে কারণে আগেই আমাদের স্ক্রিপ্ট নিয়ে ডায়ালগ ঠোঁটস্থ করে ফেলতাম।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top