খুলেছে স্কুল কলেজ মাদ্রাসা : শিখন ঘাটতি পুষিয়ে নেয়ার চ্যালেঞ্জ

khulna-school-picture-12.09.21-1-1.jpg

 করোনার তান্ডবে দেড় বছর বন্ধ ছিল স্কুল। ক্লাস শুরুর প্রথম দিনে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখছেন রূপসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মানস রায়।

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেড় বছরের ধুলো ময়লা জমেছিল টেবিলে-বেঞ্চে। ধুয়ে মুছে ছাপ করা হয়েছে সব। কোথাও রঙ চটেছিল, পলেস্তারা খসেছিল। সেগুলো মেরামত হয়েছে। নতুন রঙের আচর পড়েছে। ঘন্টাধ্বনি বাজার সাথে নিষ্প্রাণ পড়ে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে ফিরে এসেছে প্রাণের স্পন্দন। খুলনার প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও মাদ্রাসা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে রবিবার সকালের চিত্র এটি। করোনার ভয়াবহতা কাটিয়ে গতকাল থেকে শুরু হয়েছে স্কুল কলেজ।

শিক্ষার্থীরা ফিরছে, তাই কিছু প্রতিষ্ঠানে ছিল বরণের আয়োজন। ফুল ও চকলেট তুলে দেওয়া হয়েছে অনেক স্থানে। জরি আর রঙিন ঝালরে সাজানো হয়েছে শ্রেণী কক্ষ। শিশুদের স্কুলে দেখা গেল বর্ণিল বেলুন। বৈশ্বিক মহামারি করোনায় ৫৪৩ দিন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ থেকে বঞ্চিত হয়েছে শিক্ষার্থীরা। এখন রোগ নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে পৌছে যাওয়ায় পেছনের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার চ্যালেঞ্জ সবার সামনে।

সাড়ে ৯টায় ক্লাস শুরুর কথা। ৯টা বাজার আগে থেকেই একজন দুইজন করে শিশুকে আসতে দেখা গেল রূপসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। অনেকের সাথেই অভিভাবক। এতো দিন পরে প্রিয় ক্যাম্পাসে পা রাখতেই উচ্ছসিত হয়ে উঠলো তারা। পুরানো বন্ধুদের সাথে মোলাকাত, গল্প, হাসি আনন্দ। অনেক দিনের অব্যবহৃত দোলনা আর স্লিপারে চড়ে বসলো কেউ কেউ।

মেইন গেটের সামনেই টেবিল চেয়ার নিয়ে বসেছেন দু’জন শিক্ষক। একজন থার্মাল মিটার দিয়ে শিক্ষার্থীদের টেম্পারেচার মাপছেন। অন্যজন যারা মাস্ক ছাড়া এসেছে তাদেরকে ফ্রি মাস্ক পরিয়ে দিচ্ছেন। এরপর মূল ভবনে প্রবেশের আগে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হচ্ছে। তারপর হ্যান্ড স্যানিটারইজার স্প্রে করে নিশ্চিত করা হচ্ছে পরিচ্ছন্নতা।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক মানস কুমার রায় বললেন, শিক্ষার্থীদের শারীরিক নিরাপত্তাকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। মন্ত্রণালয় থেকে দেয়া গাইড লাইন সম্পূর্ণ মানার চেষ্টা করছি। আজ প্রথম দিনে তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণীর ক্লাস হবে। আমাদের শিক্ষার্থী অনেক। এজন্য দুই শিফটে ভাগ করে ক্লাস নেবো। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১টা ৫ মিনিট পর্যন্ত। আবার দুপুর ১টা থেকে ৩টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত। ফাইভের ক্লাস প্রতিদিন হবে। শিখন ঘাটতি পুষিয়ে নিতে কি কি করণীয় এ সম্পর্কে উপস্থিত অভিভাবকদেরকে বিভিন্ন পরামর্শ দেন তিনি।

খুলনা জেলা শিক্ষা অফিসার খন্দকার রুহুল আমীন বলেন, শিক্ষামন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মেনে খুলনা জেলার সকল সরকারি বেসরকারি স্কুল,কলেজ ও মাদরাসা খুলেছে। এর মধ্যে ৪২০টি স্কুল, ১২৫টি মাদরাসা ও ৭৩ টি কলেজ রয়েছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সূত্রে জানা যায়, খুলনা জেলায় ১ হাজার ১৫৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ৪২০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে মহানগরে ১৫৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ১শ’ টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। বাকিগুলো জেলার ৯টি উপজেলায় অবস্থিত।

সেন্ট জোসেফস উচ্চ বিদ্যালয়ের ৫ শ্রেণীর শিক্ষার্থী বিজয় রায় বলেন, স্কুল ১০টায় শুরু হলেও অনেক দিন পর স্কুল খোলায় ৭টার সময় চলে এসেছি। স্কুল খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে। দেখে ভীষণ ভালো লাগছে। একই স্কুলের ১০ শ্রেণীর দীপ্ত সরকার বলেন, অনেক দিন পর সহপাঠীদের সাথে দেখা হয়েছে। করোনার কারণে ঘর বন্দি থাকতে থাকতে অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। এখন স্কুল খুলেছে আবার আগের মতো আমরা স্কুলে এসে ক্লাস করতে পারবো।

সরকারি করোনেশন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রীর অভিভাবক রাজিয়া সুলতানার বলেন, এতো দিন বন্দি জীবন ছিল আমার মেয়ের। এতে সে মানসিক চাপে থাকতো। এখন ক্লাসে এসে সহপাঠীদের সাথে দেখা হওয়ায় স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে।

শিপইয়ার্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি শেষে আজ থেকে চালু হয়েছে সশরীরে ক্লাস। এতে শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকরা অনেক খুশি। তবে ক্ষতি পূষিয়ে নিতে আমাদের সামনে দীর্ঘ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সম্মিলিত চেষ্টায় লেখাপড়ার পরিবেশ ও মান ফিরিয়ে আনতে হবে।

খুলনা সরকারি মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক বিকাশ রায় বলেন, শিক্ষা নিকেতনের সাথে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক অতি প্রাচীন এবং অত্যাবশকীয়। সংক্রামক ব্যধির আগ্রাসন সে সম্পর্ক ভেঙে গৃহবন্দী করেছিল। আজ সে বন্দীদশা ছেড়ে আবার শিক্ষায়তনে ফিরেছে শিক্ষার্থীরা। এটা আসলে কতটা আনন্দের তা ভাষায় ব্যক্ত করে বোঝানো যাবে না।

খুলনা জিলা স্কুল, সরকারি করোনেশন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, খুলনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, খুলনা সরকারি ল্যাবরেটরি উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি ইকবাল নগর বালিকা বিদ্যালয়, সেন্ট জোসেফস উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি মহসিন উচ্চ বিদ্যালয়সহ সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির অনেক বেশি। অধিকাংশ স্কুলের সামনে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top