ভাঙনে দিশেহারা মানুষ : ৮ টি ঢাকা শহরের সমান ভূমি নদীগর্ভে

image-460370-1630527055.jpg

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে চলছে বন্যা। পাশাপাশি নামছে এই বানের পানি। নেমে যাওয়ার পথে তা ভেঙে নিচ্ছে দুই পাড়। বর্ষায় নদীভাঙন স্বাভাবিক হলেও এ বছর তা ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। বাংলাদেশের ব্রহ্মপুত্রের প্রবেশমুখ কুড়িগ্রাম থেকে রাজবাড়ী পর্যন্ত (গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, টাঙ্গাইল ও মানিকগঞ্জ) বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ভাঙন চলছে।

পাশাপাশি রাজবাড়ী থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত (মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ঢাকা) পদ্মার দুই পারের জেলায়ও একই অবস্থা। এছাড়া চাঁদপুর থেকে বঙ্গোপসাগরে যাওয়া পর্যন্ত মেঘনা এবং এর শাখা নদীগুলোও ভেঙে নিচ্ছে লোকালয় ও ফসলের মাঠ। এই বড় তিন নদীসহ শাখা নদীগুলোর রুদ্ররোষে দরিদ্র মানুষ পড়ছে সীমাহীন দুর্ভোগে। সহায়-সম্পদ হারিয়ে অনেকেই রাতারাতি ভূমিহীনে পরিণত হচ্ছেন।

সরকারি সংস্থাগুলো গত জুনেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল, চলতি বছর কেবল পদ্মা ও যমুনা অববাহিকা এলাকায়ই ২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে। মৌসুম শেষ না হওয়ায় এ ব্যাপারে প্রকৃত চিত্র মেলেনি। তবে ১৯৭৩ সালের পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত চার যুগে ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হওয়া জমির পরিমাণ ৫ লাখ ১৪ হাজার ৬৭১ দশমিক ৯৫ একর বলে জানা গেছে।

এসব জমি প্রায় ৮টি ঢাকা শহরের সমান। ঢাকার বর্তমান আয়তন ২৭০ বর্গকিলোমিটার বা ৬৬ হাজার ৬৯০ একর। এর মধ্যে পদ্মা ও যমুনায় ভাঙা জমির পরিমাণ ১ লাখ ৫৭ হাজার ৮৫০ হেক্টর। আর এর বিপরীতে চর জেগেছে মাত্র ৪৯ হাজার ১৫০ হেক্টর। অর্থাৎ, ভাঙনের তুলনায় নতুন চর তৈরির পরিমাণ এক-তৃতীয়াংশ।

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের (আইডব্লিউএফএম) অধ্যাপক ড. মনসুর রহমান বলেন, নদীভাঙনের মূল কারণ দুটি। একটি প্রাকৃতিক, আরেকটি ভূ-গঠনগত। চলার পথে নদী পলি বহন করে। উজান থেকে যখন সে পর্যাপ্ত পলি নিয়ে আসতে পারবে না, তখন স্বল্পতা পূরণের স্বার্থে কূল ভাঙবে। যদি উপর থেকে পাড় বেঁধে দেওয়া হয়, তাহলে তলদেশ থেকে সে ভেঙে নেবে।

একসময় তলদেশের মাটি সরে গিয়ে উপরিভাগ ভেঙে পড়বে। মূলত উজানে প্রচুর বাঁধ ও ড্যাম তৈরি হওয়ায় পলি আসার হার কমে গেছে। এটাই নদীভাঙনের একটি কারণ। আরেকটি হচ্ছে, উজান থেকে স্বাভাবিকের বেশি পলি আসে, তখন তা ভাটির দিকে নদীতেই জমে তলদেশ ভরাট করে। এমন পরিস্থিতি নদীর স্বাভাবিক গতিপথ বিঘ্নিত হয়েও পাড়ে ভাঙন সৃষ্টি করতে পারে।

তবে নদী যে কেবল ভাঙে তা নয়, একদিকে ভাঙলে আরেকদিকে তা নতুন ভূমি তৈরি করে। নদী কখন কোথায় ভাঙবে, তা বলা কঠিন। তাই ভাঙনপ্রবণতা বিবেচনা করে স্থাপনাদি তৈরি করতে হবে। বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নদীকে বুঝতে পারলে আমাদের ক্ষয়ক্ষতিও কম হবে।

গত ২৯ জুন জাতীয় সংসদে নদীভাঙন সম্পর্কিত তথ্য তুলে ধরেন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী। তিনি জানান, বর্তমানে দেশে ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন (সিকস্তি) হওয়া জমির পরিমাণ ৫ লাখ ১৪ হাজার ৬৭১ দশমিক ৯৫ একর। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সিকস্তি জমি আছে চট্টগ্রাম বিভাগে। সবচেয়ে কম সিলেট বিভাগে। বিভাগভিত্তিক সিকস্তি জমির মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৪৯ হাজার ১৪২ দশমিক ৯৮ একর, চট্টগ্রামে ১ লাখ ৭৩ হাজার ১৬২ দশমিক ৯৩ একর, খুলনায় ৩০ হাজার ৬৭১ দশমিক ১৫ একর, রাজশাহীতে ৯৭ হাজার ৩৬৩ দশমিক ৮৪ একর, রংপুরে ১৫ হাজার ৪৮ দশমিক ৭৮ একর, সিলেটে ৩১ দশমিক শূন্য ৭ একর, ময়মনসিংহে ৪ হাজার ৯৬৭ দশমিক ৪৪ একর, বরিশালে ১ লাখ ৪৪ হাজার ২৮৩ দশমিক ৭৭ একর জমি আছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের (এফএফডব্লিউসি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, ধলেশ্বরী ও পদ্মায় বন্যা চলছে। চলতি মৌসুমে এছাড়া মেঘনা, তিস্তা, দুধকুমার, সুরমা, কুশিয়ারা, মুহুরী, মেঘনা, খোয়াই, সাঙ্গুসহ আরও কয়েকটি নদীতেও বন্যা দেখা দিয়েছিল। তবে ভরা বর্ষা হওয়ায় প্রধান নদীগুলোয় পানিপ্রবাহ বেড়েছে। সব পানির গন্তব্যই বঙ্গোপসাগর। আর যাওয়ার পথে তা ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে তীরবর্তী এলাকা। গ্রামীণ জনপদের নতুন আপদ এটা।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে ৮৫টি শহর, বন্দরসহ মোট ২৮৩টি স্থানে নিয়মিতভাবে প্রতিবছর মারাÍক ভাঙন দেখা দেয়। এছাড়া প্রায় ১২শ কিলোমিটার তটরেখা নদীভাঙনপ্রবণ এলাকা হিসাবে চিহ্নিত। আর এবারের মৌসুমের শুরুতে এই মন্ত্রণালয়ের ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) পদ্মা-গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর গতিপ্রকৃতি পর্যালোচনা করে পূর্বাভাস করেছিল, এ মৌসুমে নদীভাঙনের কবলে পড়তে পারে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের ১৩ জেলা।

এতে এসব জেলার প্রায় ২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে। এছাড়া পৌনে ৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ, ২৪১ মিটার মহাসড়ক, সাড়ে ৩ কিলোমিটার জেলা ও দেড় কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক চলে যেতে পারে নদীতে। ভাঙনে দোকানপাট, বসতবাড়ি, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, হাটবাজার এমনকি হাসপাতালও বিলীন হয়ে যেতে পারে। গত বছরও প্রায় একই ধরনের পূর্বাভাস দিয়েছিল সংস্থাটি, যার প্রায় ৮৫ শতাংশ মিলে যায় বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির উপদেষ্টা ড. মমিনুল হক সরকার।

সিইজিআইএসের এবারের পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল, এ বছর ১৩ জেলার ২০ স্থানে ভাঙন ভয়াবহ পর্যায়ে চলে যেতে পারে। জেলাগুলো হচ্ছে-কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর ও মাদারীপুর। ডিসেম্বর পর্যন্ত পদ্মা-গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীপারের ৩৪২ বসতবাড়ি, ৪০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ২৬টি মসজিদ-মন্দির, ৫টি হাটবাজার, ২টি সরকারি ও ২টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভেঙে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, সাধারণত ১ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ১ হাজার মানুষের বসবাস আছে।

সেই হিসাবে এ বছর নদীভাঙনের কারণে বাস্তুহারা হতে পারে প্রায় ২৮ হাজার মানুষ। জানা যায়, সংস্থাটির গত বছরের পূর্বাভাসে প্রায় ২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়। তবে বাস্তবে প্রায় ৩৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা ভেঙেছে গত বছর। মূলত কয়েক দফায় দেশ বন্যায় পড়ায় ২০২০ সালে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

সংশ্লিষ্টরা জানান, উল্লিখিত নদীভাঙনের কারণে বিলীন হয়ে গেছে লাখ লাখ বসতঘর, অট্টালিকা, হাটবাজার, মসজিদ-মাদ্রাসা, হাসপাতাল, সড়ক, ব্রিজ, ফসলি জমি, গাছপালাসহ সবকিছু। সিইজিআইএসের সমীক্ষা অনুযায়ী, ১৯৭৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত পদ্মা, যমুনা ও গঙ্গা নদীর অববাহিকায় ভাঙনের কারণে প্রায় ১৭ লাখ ১৫ হাজার মানুষ বাস্তচ্যুত হয়েছে।

অবশ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লাখ গৃহহীন ভাসমান মানুষ আছে। এদের বেশির ভাগই নদীভাঙনের সৃষ্টি। প্রতিবছর এদের সংখ্যা গড়ে লাখ করে বাড়ছে। ভাসমান এসব মানুষ সাধারণত বাঁধ, রাস্তা, পরিত্যক্ত রেল সড়ক, খাস চর বা খাসজমি প্রভৃতি স্থানে জীবনযাপন করে। অভাবের তাড়নায় এদের একটি অংশ শহরমুখী হয়, যাদের অনেকেরই ঠাঁই হয় শহরের বস্তিতে। নদী ভাঙার বিপরীতে চর জেগে ওঠার পরিমাণ মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। আবার নতুন চরের জমি প্রকৃত মালিকদের না পাওয়ার অভিযোগই বেশি। সাধারণত প্রভাবশালীরা নানাভাবে জেগে ওঠা চর দখল করে নিয়ে যায়।

বুয়েটের আইডব্লিউএফএমের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম বলেন, নদীভাঙনের জমি সাধারণত প্রকৃত মালিকরা দুই কারণে ফেরত পান না। প্রথমত, ভেঙে যাওয়ার পর অনেকেই এর খাজনা আর দেন না। দ্বিতীয়ত, কোনো এলাকা ভাঙা শুরু হলে প্রভাবশালীরা পানির দরে তা কিনে নেন। এরপর তারা এর খাজনা চালিয়ে যান। ফলে ৩০-৪০ বছর পর সেখানে চর জেগে উঠলে তা দখলে নিয়ে নেয়।

 

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top