অনিয়মকে নিয়ম করেই চলছে জবির পরিবহন পুল

jnu-20220827130254.jpg

ডেস্ক রিপোর্ট : নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) পরিবহন পুলের বিরুদ্ধে। খরচের চালানে অনিয়মকে নিয়ম করে অর্থ লোপাট, ভিন্ন চালানে একই পণ্যের একাধিক মূল্য, একই মডেলের গাড়িতে অতিরিক্ত দামে একই যন্ত্রাংশের ব্যবহার, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ইঞ্জিনিয়ার থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত লাভের আশায় বাইরে থেকে কাজ করানো, কর্মস্থলে উপস্থিত না থেকেও হাজিরা দিয়ে বেতন গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মকে নিয়ম করেই চলছে এই দপ্তর। ফলে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের। আর লাভ হচ্ছে কিছু মধ্যসত্বভোগীর।

অনুসন্ধানে জানা যায়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪-০১৯১ নম্বরের গাড়ির জন্য গত ২৯ মে পিসিভি ২৯ প্লেটের হ্যামকো ব্যাটারি কেনা হয় বাহদুরশাহ পার্ক মিনিউসিপ্যাল মার্কেটের মেসার্স এস বি ব্যাটারি নামের দোকান থেকে। দুই পিস ব্যাটারির মূল্য রাখা হয় ৩০ হাজার ১০০ টাকা। পুরোনো দুটি ব্যাটারি বাবদ বাদ দেওয়া হয় ১০ হাজার ৫০০ টাকা। এই চালানে মোট খরচ দেখানো হয় ১৯ হাজার ৬০০ টাকা। চালানে গাড়িচালক মাজহারের স্বাক্ষর রয়েছে।

আরও পড়ুন : কাঁচা মরিচের কেজি ৩০ টাকা

এই চালানের মাত্র ১০ দিন আগে আরেকটি চালানে দেখা যায়, একই মডেলের দুটি ব্যাটারি একই দোকান থেকে কেনা হয় অতিরিক্ত দামে। ১৮ মে একই মডেলের ব্যাটারি দুটি ১৪-০১৫০ নম্বর গাড়ির জন্য কেনা হয় হয় ৩২ হাজার ৪৮০ টাকায় এবং পুরোনো দুটি ব্যাটারি বাবদ বাদ দেওয়া হয় ৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ, আগের ও পরের একই ব্যাটারি কেনা ও ব্যাটারি বাবদ বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে ৫ হাজার ৩৮০ টাকার গড়মিল রয়েছে। গড়মিল সত্ত্বেও চালানে স্বাক্ষর করেন পরিবহন পুলের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. শাহাদাৎ হোসেন তুষার ও পরিবহন প্রশাসক মাসুদ।

ব্যাটারির চালানে দাম কম-বেশির বিষয়ে এস বি ব্যাটারি দোকানের মালিক মহিদুর রহমান বলেন, ব্যাটারির দাম বাড়া ছাড়া কমার সম্ভাবনা নেই। এমন ঘটেওনি। তবে অনেক সময় অনেক ক্রেতা এসে চালান লেখার সময় চা খরচ ও যাওয়া আসার ভাড়া বাবদ কিছু টাকা বাড়িয়ে লেখার জন্য অনুরোধ করে।

চালানে টাকার অংক বেশি লেখার সঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ব্যক্তি জড়িত কি না জানতে চাইলে তিনি নাম বলতে রাজি হননি।অন্যদিকে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলীর ব্যবহৃত গাড়ি ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. কামালউদ্দীন আহমদের গাড়ির মডেল এক হওয়া সত্ত্বেও একই যন্ত্রাংশ ক্রয়ের ক্ষেত্রে দামের বিস্তর ফারাক। প্রকৌশলীর গাড়ির যন্ত্রাংশ ক্রয়ের চালানের থেকে কোষাধ্যক্ষের গাড়ির যন্ত্রাংশ কেনার চালানে অতিরিক্ত খরচ দেখানো হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রধান প্রকৌশলীর গাড়িতে কাজের নতুন পাইপ প্রতি পিস ৭৫০ টাকা করে কেনা হলেও কোষাধ্যক্ষের গাড়িতে একই যন্ত্রাংশের প্রতি পিস পাইপের দাম ধরা হয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা। তেমনিভাবে প্রকৌশলীর গাড়ির জন্য পুলিং চেম্বার গ্যাস চার্জ ২৫০০ টাকা, এসি সিস্টেম খোলা, ফিটিংস ও কাজের মজুরি বাবদ ২ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয় হলেও কোষাধ্যক্ষের গাড়ির পুলিং চেম্বার গ্যাস চার্জ ধরা হয়েছে ৫০০০ টাকা এবং এসি সিস্টেম খোলা, ফিটিংস ও কাজের মজুরি ধরা হয়েছে ৬ হাজার টাকা।

তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কোনো ওয়ার্কশপ না থাকায় বাইরে থেকে কাজ করাতে হয়। ফলে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে।এদিকে কর্মস্থলে উপস্থিত না থেকেও বেতন গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে পরিবহন পুলের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (দৈনিক হাজিরা ভিত্তিক) হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি বেশিরভাগ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকেন। অনুপস্থিত থেকেও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দৈনিক হাজিরা ভিত্তিক বেতন উত্তোলন করেন।

জানা গেছে, গত বছর ডিসেম্বরের ২১, ২২ ও ২৩ তারিখে তিনি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির আবেদন জমা দিতে গিয়ে নিজ বাড়িতে অবস্থান করেও ওই তিন দিনের হাজিরা নেন। তাছাড়া তিনি ডুয়েট বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি মাসে ২৯/৩০ দিনের হাজিরা নেন। এমনকি করোনাকালেও পূর্ণ মাসের হাজিরা গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। তার বাবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারারের গাড়ির চালক হওয়ায় এসব অতিরিক্ত সুবিধা নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

আরও পড়ুন : ডেমরায় অটোরিকশা চালকদের সড়ক অবরোধ

এ বিষয়ে জানতে পরিবহন পুলের উপ-সহকারী প্রকৌশলী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাইলে ফোন কেটে দেন তিনি।এদিকে কোনো প্রকার রিকুইজিশন ছাড়াই ব্যক্তিগত কাজে গাড়ি ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে পরিবহন পুলের ডেপুটি রেজিস্ট্রার শাহাদাৎ হোসেনের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, উপাচার্যের গাড়ি মেরামতের জন্য র‍্যাংকস কোম্পানিতে নেওয়া হলে আনুমানিক বিল ৬৭ হাজার ৯২৫ টাকা ধার্য করে কোম্পানিটি। তবে কাজটি ওই কোম্পানিতে না করিয়ে বাইরে থেকে দ্বিগুণ খরচে করানো হয়।

এসব বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি পরিবহন পুলের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. শাহাদাৎ হোসেন। তিনি বলেন, আমি কোনো মুখপাত্র নই। স্যারের (পরিবহন প্রশাসক) অনুমতি ছাড়া আমি কোনো তথ্য দেব না। তাছাড়া আমি তথ্য দিতে বাধ্য নই।এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পরিবহন পুলের দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ বলেন, আমি এ বিষয়ে জানি না। যদি এমন অভিযোগ আসে তবে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি ঘটনা সত্য হয় তাহলে অবশ্যই শাস্তি পাবে।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top