বাসে গণধর্ষণের স্বীকার মেয়েটি চালকের পূর্ব পরিচিত?

1659764519.BUS-tan.jpg

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি : কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে যাওয়া ঈগল পরিবহনের ঘটনা কি পূর্ব পরিকল্পিত? গণধর্ষণের স্বীকার ওই নারী কি বাসচালক ও সুপারভাইজারের পূর্ব পরিচিত? এমন প্রশ্ন মনে আসাটা খুব একটা অস্বাভাবিক না। কারণ জানা গেছে, নির্যাতিতা নারী ঈগল পরিবহনের অন্য একটি বাসের সুপারভাইজারের সাবেক স্ত্রী।

ঐ সুপারভাইজারের বাড়ী পাবনা জেলার সদর উপজেলায়। আবার যে বাসে ডাকাতি ও গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ওই বাসটির সুপারভাইজার ও হেলপারের বাড়িও পাবনার সদর উপজেলায়। কিছুদিন আগে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। এর পর থেকে ওই নারী তার বাবার বাড়ি দৌলতপুরে থাকতেন। পোশাক কারখানায় কাজের আশায় নারায়ণগঞ্জ যাচ্ছিলেন তিনি।

জানা যায়, মঙ্গলবার (০২ আগস্ট) কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা প্রাগপুর থেকে দুইজন যাত্রী নিয়ে ছেড়েছিল বাসটি। এরপর পাবনার ঈশ্বরদী পর্যন্ত পরিবহনটির সবগুলো কাউন্টার মিলিয়ে ২৬ জন যাত্রী ওঠেন। পরে বাসটিতে ডাকাতি ও গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে।
ওই বাসে থাকা যাত্রী বিপ্লব হোসেন নারায়ণগঞ্জে ইজিবাইক চালান। বাড়ি মেহেরপুর।

আরও পড়ুন : গোবিন্দগঞ্জে বাসচাপায় ভ্যানচালকসহ নিহত ২

দৌলতপুর থেকে ঈগল পরিবহনে পরিবার নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি।তার ভাষ্যমতে, ধর্ষণের স্বীকার মেয়েটি ছিলেন তার সিটের দুই সারি পেছনে। বাসের সর্বশেষের সারিতে একায় বসেছিলেন। তাঁর পাশে দুর্বৃত্ত দলের দুই তরুণ গিয়ে বসেন। ডাকাতির সময় পুরুষ যাত্রীদের হাত, মুখ ও পা বেঁধে বসিয়ে রাখা হয়। মেয়েটির সঙ্গে ওই দুই তরুণের কথা-কাটাকাটি হয়।

একপর্যায়ে কয়েকজন মিলে মেয়েটিকে ধর্ষণ করেন। মেয়েটির মুখে কাপড় গোঁজা ছিল। তার গোঙানোর শব্দ আসছিল। কিন্তু কেউ তাকে রক্ষার জন্য এগিয়ে যেতে পারেননি। যদি কেউ কোনো শব্দ করছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে তাকে আঘাত করা হচ্ছিল। এক যাত্রী ৯৯৯-এ কল করতে গেলে তাকে ছুরি দিয়ে পোচ দেওয়া হয়। ওই যাত্রীর শরীর থেকে রক্ত বের হয়। এরপর ভয়ে কেউ কোনো শব্দ করেননি।

দৌলতপুর উপজেলার সালিমপুর এলাকার ফল ব্যবসায়ী হেকমত আলী, তার স্ত্রী, দুই সন্তান ও শাশুড়িকে নিয়ে ওই বাসে ঢাকায় যাচ্ছিলেন।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে তিনি জানান, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে সিরাজগঞ্জে একটি হোটেলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় ঈগল পরিবহনের বাসটি। সেখানে বিরতি শেষে দিবাগত রাত পৌনে ১২টার দিকে ঢাকার দিকে চলতে থাকে।

কিছুক্ষণ পরে একটি জায়গা থেকে চার তরুণ বাসের সামনে থেকে হাত তুলে ইশারা দেন। বাসচালকের সহকারী সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে ওই তরুণদের সঙ্গে কথা বলেন। দু-এক মিনিটের মধ্যে চারজন বাসে উঠে পড়েন এবং সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলে বাসের পেছনের দিকে গিয়ে বসেন। এই চার তরুণের প্রত্যেকের মুখে মাস্ক ছিল। তাদের একজনের পিঠে ব্যাগ ছিল।

তারা পেছনে বসার পর পর মোবাইল টেপাটিপি করতে থাকেন। বাস আরও ১৫ মিনিটের মতো চলে। এরপর রাস্তা থেকে আরও পাঁচজন একইভাবে বাসে ওঠেন। তারাও কয়েকটি সিটে বসে পড়েন। কয়েক মিনিট পর আরেকটু সামনে গিয়ে আরও দুজন ওঠেন। এর পরপরই বাসের চালককে বাস থামাতে বলা হয়। চালক থামাতে রাজি না হলে তাঁকে মারধর করেন তরুণদের দল।

একজন তরুণ দ্রুত তাকে সরিয়ে চালকের আসনে বসে বাসের নিয়ন্ত্রণ নেন। পরে বাসের সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়। জানালার গ্লাসগুলো আটকে দেওয়া হয়। ডাকাতরা প্রত্যেকের কাছে গিয়ে শরীর তল্লাশি করে টাকা, মোবাইল ফোন এবং নারী যাত্রীদের কাছ থেকে স্বর্ণালংকার লুটে নেন। একাধিকবার যাত্রীদের শরীর তল্লাশি করেন। পেছনের ছিটে থাকা এক নারীকে তল্লাশি করার সময় ওই নারী প্রতিবাদ করেন।

এরপর দুই তরুণ ওই নারীকে মারধর করেন, শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন।হেকমত আলীর স্ত্রী জেসমিন আরা বলেন, এক সন্তানকে বুকে জড়িয়ে মাথা নিচু করে সৃষ্টিকর্তার নাম নিচ্ছিলাম। সামনে আরেক সিটে আমার মা বসেছিলেন আরেক সন্তানকে নিয়ে। তার হাত, চোখ, মুখ বাঁধা ছিল। ডাকাত দল সব কাজ শেষ করার পর একে অপরকে ডাকাডাকি করেন। ডাকাত দলের সরদারকে তারা ‘কাকা’ বলে সম্বোধন করছিলেন।

মাঝেমধ্যে নুরু, সাব্বির, রকি নামেও ডাক দিচ্ছিল। রাত ৩টার দিকে ডাকাতরা টাকা, মোবাইল ও স্বর্ণালংকার নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি শুরু করে। বাসের ভেতরে ভাগাভাগি নিয়েও তাদের মধ্যে বাগ-বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে সড়কের এক পাশে গাড়িটি থামিয়ে দ্রুত তারা নেমে চলে যায়। বুধবার রাত ৯টার দিকে বিআরটিসির গাড়িতে পুলিশ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে তাদের কুষ্টিয়া পাঠিয়ে দেয়।

গণধর্ষণের স্বীকার মেয়েটির পরিবারের দাবি, গত মঙ্গলবার রাতে অনেকটা জোর করেই তাদের মেয়ে ঢাকায় যান। ঢাকায় যাওয়ার জন্য নিষেধ করেছিলেন পরিবারের লোকজন।মেয়েটির বাবা বলেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আমি তখন খাচ্ছিলাম। মেয়ে ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে যায়। বলে, ঢাকাতে গার্মেন্টসে চাকরি করবে। আমি নিষেধ করেছিলাম, শোনেনি।

তিনি জানান, চার থেকে পাঁচ বছর আগে ঈগল পরিবহন বাসের এক সুপারভাইজারের সঙ্গে তার মেয়ের বিয়ে হয়। তবে জামাতার সঙ্গে তেমন একটা যোগাযোগ হয় না। কিছুদিন আগে তাদের ছাড়াছাড়ি হয়।বাসটির মালিক পাবনার পরিবহন ব্যবসায়ী সোলায়মান হক জানান, মঙ্গলবার কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা ঈগল পরিবহনের বাসটির চালক ছিলেন কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার কৈপাল গ্রামের মনিরুল ইসলাম।

সুপারভাইজার ছিলেন পাবনা জেলা সদরের রাধানগর মহল্লার রাব্বী হোসেন ও হেলপার একই উপজেলার টেবুনিয়া গ্রামের দুলাল হোসেন। বাসে থাকা যে নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, তিনিও তার ৫টি বাসের মধ্যে একটি বাসের এক সুপারভাইজারের সাবেক স্ত্রী। ওই সুপারভাইজারও পাবনা সদরের বাসিন্দা। কিছুদিন আগে তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন : হোয়াইট হাউসের কাছে বজ্রপাত, নিহত ৩

প্রসঙ্গত, কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা যাত্রীবাহী একটি বাসে মঙ্গলবার (০২ আগস্ট) গভীর রাতে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ডাকাত দল বাসটি কয়েক ঘণ্টা তাদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ভেতরে যাত্রীদের মারধর ও লুটপাট চালায়। এ সময় এক নারী যাত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। পরে বাসটিকে রাস্তার পাশে কাত করে ফেলে ডাকাতরা পালিয়ে যায়। যা দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এ ঘটনায় ডাকাতি ও ধর্ষণের মূলহোতা রাজা মিয়া নামে একজনকে টাঙ্গাইল শহরের নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।অন্যদিকে ওই নারীর ডাক্তারি পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত মিলেছে। টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে বৃহস্পতিবার (৪ আগস্ট) দুপুরে ডাক্তারি পরীক্ষার পর বিকেলে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রুমি খাতুনের আদালতে ২২ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন ওই নারী।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top