খুলনায় ৫ ডিলারে চলছে টিসিবি’র ট্রাকসেল : বরাদ্দ নেমেছে অর্ধেকে

tcb-pic-02.jpg.crdownload-2.jpg

চাহিদা বাড়লেও বরাদ্দ কমেছে। টিসিবির সাশ্রয়ী মূল্যের পণ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অনেকে। নিজস্ব ছবি।

এহতেশামুল হক শাওন : মহানগরীতে মাত্র পাঁচজন, উপজেলাতে শুণ্য। বরাদ্দ নেমেছে অর্ধেকেরও কমে। ক্রেতারা জানেননা কবে, কখন, কোথায় গেলে সন্ধান মিলবে। অনিশ্চয়তা শেষে যদিও দেখা মিলছে, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছেনা পণ্য। ফুরিয়ে যাচ্ছে ঘণ্টা ফুরোবার আগেই। আর এভাবেই খুলনাতে চলছে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)র সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য বিক্রি।

২৬ জুলাই থেকে ডিলারদের মাধ্যমে দেশব্যাপি ভ্রাম্যমান ট্রাকে পণ্য বিক্রি শুরু করেছে টিসিবি। সরকারি ছুটির দিন ছাড়া এই কার্যক্রম চলবে আগামী ২৬ আগষ্ট পর্যন্ত। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী শোকাবহ আগষ্ট মাস ও করোনা পরিস্থিতির মধ্যে কঠোর বিধিনিষেধ চলাকালে ভোক্তাদের মধ্যে সাশ্রয়ী মূল্যে সয়াবিন তেল, মশুর ডাল ও চিনি বিক্রি হবে। প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ১০০ টাকা, প্রতি কেজি চিনি এবং ডাল ৫৫ টাকা নির্ধারণ হয়েছে।

এরআগে পবিত্র ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে জুলাই মাসের ৫ থেকে ১৮ তারিখ পর্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে এই তিনটি পণ্য বিক্রি করেছিল টিসিবি। সে সময় পনের লক্ষ জনঅধ্যূষিত খুলনা মহানগরীতে ১০ জন ডিলার প্রতিদিন পণ্য বিক্রি করতেন। এবার সে সংখ্যা কমিয়ে প্রতিদিন মাত্র পাঁচজন ডিলারকে পণ্য দেওয়া হচ্ছে।

ক্রেতাদের মধ্যে তেলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকলেও বরাদ্দ কমিয়ে দেয়া হচ্ছে মাত্র ৪০০ লিটার। অথচ ঈদের আগে প্রত্যেক ডিলারকে দেয়া হতো ১০০০ লিটার। পণ্য সরবারহ কমিয়ে দেওয়ায় বিক্রি শুরুর ঘন্টাখানেক সময়ের মধ্যেই ফুরিয়ে যাচ্ছে তেল। এরপর দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষমান ক্রেতাদের সাথে বাকবিতন্ডা হচ্ছে ডিলারের লোকজনের।

সূত্র জানিয়েছে, খুলনা মহানগরী এলাকার জন্য টিসিবির তালিকাভূক্ত ডিলার রয়েছেন ৫২ জন। আর পণ্য বিক্রির জন্য তাদের নির্ধারিত রয়েছে ৪৫ টি পয়েন্ট। রোটেশন পদ্ধতিতে ডিলার ও পয়েন্ট বন্টন করায় একজন ডিলার দুই সপ্তাহে মাত্র একবার পণ্য বরাদ্দ পাচ্ছেন। আর একটি পয়েন্টের ক্রেতাদের পরবর্তীতে ওই পয়েন্টে পণ্য পেতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে প্রায় দেড় সপ্তাহ।

মহানগরী এলাকার জন্য কিছু বরাদ্দ মিললেও পুরোপুরি বঞ্চিত জেলার নয় উপজেলার বাসিন্দারা। উপজেলা পর্যায়ে টিসিবির তালিকাভূক্ত ১৩০ জন ডিলার আজ পর্যন্ত বরাদ্দ পাননি কোন পণ্য। ফলে ঘোষণা দিয়ে শুরু হওয়া সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য কেনার সুযোগ মিলছেনা গ্রামাঞ্চলের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর।

সরেজমিনে ট্রাক সেল কার্যক্রম :

বুধবার (২৮ জুলাই) নগরীর পাঁচটি পয়েন্টে ডিলারের মাধ্যমে টিসিবির পণ্য বিক্রি হয়। ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমি বয়রা, রোটারি স্কুল খালিশপুর. খালাসী মাদ্রাসা মাঠ, লায়ন্স স্কুল মাঠ নিরালা এবং পশ্চিম বানিয়াখামার ক্লাবের মোড়।
সকাল সাড়ে ১০ টায় লায়ন্স স্কুল মাঠে টিসিবির ট্রাক ঘিরে দেখা গেল নারী-পুরুষের পৃথক দুটি লাইন। সামাজিক দূরত্ব রাখতে রিক্সার বাতিল টায়ার ফেলে দাঁড়ানোর স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। কিছু সময় পরপর একজন দুই জন করে ক্রেতা যোগ হচ্ছেন সেই লাইনে। দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় কাদা পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন তারা।

লাইনের শুরুতেই দাঁড়িয়ে ছিলেন ব্যাংক কলোনীর বাসিন্দা আব্দুস শুকুর। স্ট্রোক করে কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলার পর সংসারের এইসব কাজ যেন তার কর্তব্যের অংশ। সকালে হাটতে বেরিয়ে স্কুল মাঠে টিসিবির গাড়ি ঢুকতে দেখে তড়িঘড়ি লাইনে এসে দাঁড়িয়েছেন।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তারিকুল। লকডাউনে দীর্ঘদিন ধরেই তার অফিস বন্ধ। কম দামে ভালো মানের জিনিস পান বলে টিসিবির পণ্যে তার আগ্রহ। এরআগে ময়লাপোতা, নিরালা ও গল্লামারী থেকে পণ্য কিনলেও এই প্রথম লায়ন্স স্কুল মাঠ থেকে কিনছেন। পণ্য বিক্রির সময় ও স্থান নির্ধারিত করে দেয়ার দাবি জানালেন তিনি।

শিউলী বেগম মোবাইল ফোনে কাউকে স্কুল মাঠে আসার জন্য ডাকছিলেন। জানালেন স্কুলের পেছনেই তার বাসা। প্রতিবেশি মহিলাদেরকে জানাচ্ছিলেন টিসিবির গাড়ি আসার বিষয়টি। নিম্ন আয়ের সংসারে তার বড় সাশ্রয় এই মালামাল।
ক্রেতাদের লাইন দীর্ঘ হলেও সোয়া ১১টাতেও বিক্রি শুরু হয়নি। ত্রিপল ও পলিথিনে ঢাকা মিনি ট্রাকে বসে দুই কেজি দুই কেজি করে চিনি ও ডাল মেপে রাখছিলেন দুইজন। তাদেরই একজন ফজর আলী জানালেন, ম্যানেজার সাহেব এসে পৌছালেই বিক্রি শুরু হবে। লকডাউনে রাস্তায় যানবাহন না থাকায় তার আসতে দেরি হচ্ছে।

পণ্যের বরাদ্দ কমে যাওয়ায় শংকা প্রকাশ করে তিনি বললেন, অল্প সময়েই মাল শেষ হয়ে যাবে। লাইনে দাঁড়ানো সবাই পাবেনা। তখন আমাদের সাথে ঝগড়া হবে। দোষ দেবে আমরা বাইরে মাল বিক্রি করে দিচ্ছি। আজকের বরাদ্দ ৪০০ লিটার তেল, ৫০০ কেজি ডাল আর ৬০০ কেজি চিনি। এতে যে কমিশন পাওয়া যাবে তাতে খরচ ওঠানো কষ্টকর। ট্রাক ভাড়া, ত্রিপল, মাল প্যাকেট করার পলিথিন, স্টাফ খরচ মিলিয়ে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা তাদের ব্যয় আছে। এই পয়েন্টে পণ্য বিক্রির ডিলার মেসার্স তানজিমা হস্তশিল্প।

আছে অভিযোগ, মিলছে সত্যতা :

মেসার্স নেসার এন্ড ব্রাদার্সের ট্রাক পাওয়া গেল পশ্চিম বানিয়াখামার প্রাথমিক বিদ্যালয় চত্বরে। সকাল সাড়ে ১১টায় গুড়িগুড়ি বৃষ্টিতে পুরোমাত্রায় বিক্রি চলছে এই পয়েন্টে। নারী পুরুষের পৃথক দুই লাইনে দুইশ‘র বেশি মানুষ। এখানে সামাজিক দূরত্ব নেই। সবার মুখে নেই মাস্ক। সিরিয়ালের বাইরেও অনেকে ট্রাকের গাঁ ঘেষে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করছেন বিক্রয় কর্মীদের সাথে।

দুই লিটার তেল, দুই কেজি ডাল ও দুই কেজি চিনির প্যাকেজ বিক্রি হচ্ছে এখানে। ক্রেতাদের হাতে হাতে ৪২০ টাকা। এই এলাকার অধিকাংশ মানুষ বিহারী সম্প্রদায়ের। মাঝে মাঝেই লাইন ভেঙ্গে চেনা পরিচিতদের পণ্য দেয়া হচ্ছে। প্যাকেজের কথা বলা হলেও অনেককেই দেখা গেল শুধু তেল নিতে, তাও আবার দুই লিটারের পরিবর্তে অন্তত ছয় বা আট লিটার। অনেকে মটর সাইকেল হাকিয়ে এসে সিরিয়াল ছাড়াই পণ্য নিয়ে চলে গেলেন।

লাইনে দাঁড়ানো ক্রেতা নওশাদ হোসেন বললেন, ২ লিটার তেল, দুই কেজি করে ডাল ও চিনি বাজার থেকে কিনতে গেলে ৫৮০ টাকা খরচ হতো। এখানে তা মাত্র ৪২০ টাকায় পাচ্ছি। তাছাড়া পণ্যের মান খুব ভালো। কিন্ত সমস্যা হলো কবে কোথায় বিক্রি হবে কেউ বলতে পারেনা। সবাইকে সমান না দিয়ে মুখ চিনে কম বেশি মাল দেয়। এসব অনিয়ম বন্ধ হওয়া উচিত।
লিয়াকত হোসেন নামের এক ক্রেতা মিডিয়া প্রকাশিত নিউজের উদ্ধৃতি দিয়ে জানালেন, ঢাকা চট্টগ্রামের একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ চার কেজি চিনি, দুই কেজি ডাল এবং দুই থেকে পাঁচ লিটার পর্যন্ত তেল কিনতে পারছেন।

টিসিবির ডিলার আবু নেছার বলেন, গত বছরের লকডাউনের শুরুতে প্রতি ডিলারকে প্রতিদিন ১৫০০ লিটার তেল, ৮০০ কেজি চিনি এবং ৮০০ কেজি করে ডাল দিয়েছে। তখন বিক্রির পয়েন্টও নির্ধারিত ছিল। ফলে ক্রেতারা একই স্থানে আমাদের পেতেন। এখন বাই রোটেশন পণ্য বরাদ্দ দিচ্ছে। তাও বরাদ্দ কমেছে অর্ধেক। আমরা ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে পারছিনা।

সিদ্ধান্ত কেন্দ্রের, অনিয়ম বন্ধে রোটেশন :

টিসিবির আঞ্চলিক কর্মকর্তা আনিছুর রহমান জানান, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে খুলনা মহানগীতে প্রতিদিন পাঁচ জন ডিলারের মধ্যে পণ্য বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। এবার দীর্ঘ সময়ব্যাপি পণ্য বিক্রি করা হবে, তাই প্রতিদিনের বরাদ্দও কমেছে।

প্রতিদিন একই স্থানে পণ্য বিক্রি করা হলে সেখানে একটি সিন্ডিকেট তৈরি হয়। অনিয়ম বেড়ে যায়। একই ব্যক্তি বারবার পণ্য পায়। বঞ্চিত হয় অন্য এলাকায় যাদের প্রাপ্য তারা। সেজন্য আমরা মহানগরীতে ৪৫ টি পয়েন্ট চিহ্নিত করেছি এবং বাই রোটেশন প্রতিটি পয়েন্টে আমাদের ট্রাক যাবে।

কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত ছাড়া ডিলার সংখ্যা এবং বরাদ্দ বাড়ানো সম্ভব না। আর উপজেলা পর্যায়ে ডিলারদের মধ্যে পণ্য বরাদ্দের আপাতত সিদ্ধান্ত নেই। আগামী মাসের (আগষ্ট) প্রথম সপ্তাহে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে।

পণ্য বিক্রিতে প্যাকেজ সিস্টেম ডিলারদের সৃষ্টি দাবি করে টিসিবির অঞ্চলিক কর্মকর্তা আনিছুর রহমান বলেন, দেখা গেল একটা পণ্যের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি। অন্য পণ্য কম চলছে। কিন্ত তাকে তো সব আইটেম বিক্রি করতে হবে। এজন্যই হয়তো প্যাকেজে সব পণ্য কেনার কথা তারা বলে। কিন্ত এমন কোন বাধ্যবাধকতা আমাদের পক্ষ থেকে দেয়া হয়না। *

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top