করোনা নমুনা পরীক্ষায় অনীহা : বাড়ছে সংক্রমণ

image-327644-1595213893.jpg

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কমাতে রাজধানীর ওয়ারীতে চলছে লকডাউন। শুরুতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলেও এখন অনেকটা স্বাভাবিক পরিবেশ বিরাজ করছে।

৪ জুলাই থেকে ২১ দিনের লকডাউন শুরুর পর এখানে সংক্রমণ কমেনি, বরং বেড়েছে। করোনার নমুনা পরীক্ষায়ও অনীহা রয়েছে এলাকাবাসীর মধ্যে। লকডাউন বাস্তবায়ন করতে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবকরা স্থানীয়দের হুমকির মুখে পড়েছেন। রোববার লকডাউন এলাকা সরেজমিন ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

লকডাউন শুরুর আগে ওয়ারীতে করোনা রোগী ছিল ৪৬ জন। ১৬ দিনের মাথায় রোগীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ১৭ জুলাই পর্যন্ত এখানে ২০৫ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

এর মধ্যে ৮০ জনের করোনা পজিটিভ ধরা পড়েছে। লকডাউন এলাকায় স্থাপিত করোনা পরীক্ষার বুথ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী- নমুনা পরীক্ষার জন্য এলাকাবাসীর মধ্যে খুব একটা আগ্রহ নেই।

প্রতিদিন ৫০ জনের নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা রয়েছে এ বুথের। এর সক্ষমতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু শুরু থেকে এখানে মানুষ খুব একটা আসছিল না।

প্রত্যাশার চেয়ে কম মানুষ আসছে পরীক্ষা করানোর জন্য। ৮ জুলাই সবচেয়ে বেশি মানুষের পরীক্ষা হয়েছে। এদিন ২৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করানো হয়। ১৪ জুলাই ৯ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়।

লক্ষাধিক মানুষের মধ্যে নমুনা পরীক্ষার এ হারকে অস্বাভাবিক মনে করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। এখানে লকডাউন ঠিকমতো পালিত হচ্ছে না বলে ১৭ জুলাই নগর ভবনের এক সভায় তিনি অভিমত প্রকাশ করেন। লকডাউন আরও কঠোর করার পাশাপাশি মানুষকে নমুনা পরীক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান। এ অবস্থায় ১৭ জুলাই থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ শুরু হয়। তবে এতেও খুব একটা সফল হওয়া যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে আইইডিসিআরের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক জানান, লক্ষণ থাকলেও এলাকার অনেকে বিষয়টি চেপে যাচ্ছেন। বাড়ি বাড়ি গিয়েও তাদের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়ি বাড়ি যাওয়ার পরও ১৭ জুলাই মাত্র ১১ জনের নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। এর আগের দিন ১৩ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

রোববার বিকালে ওয়্যার স্ট্রিট রোডে স্বেচ্ছাসেবক রাকি ও হাসিবসহ কয়েকজন জানান, লকডাউনের প্রথম দিন থেকে মানুষকে বোঝাচ্ছি। কিন্তু এলাকার লোকজন লকডাউন মানতে চান না। নানা অজুহাতে তারা বের হতে চান। শুরুতে স্বেচ্ছাসেবকদের তারা বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন।

বের হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তারা কখনও অন্য এক স্বেচ্ছাসেবকের রেফারেন্স দিতেন। পরে ওই স্বেচ্ছাসেবককে জিজ্ঞেস করা হলে দেখা যেত তিনি ওই লোককে বের হওয়ার বিষয়ে কিছুই জানতেন না। এরপর সব স্বেচ্ছাসেবক লকডাউনের বিষয়ে আরও কঠোর হন। এ কারণে স্বেচ্ছাসেবকদের এলাকাবাসীর রোষানলে পড়তে হচ্ছে। কেউ কেউ হুমকি দিয়ে বলছেন, ‘লকডাউন শেষ হোক। তখন তোদের দেখে নেব।’

স্বেচ্ছাসেবক হাসিব বলেন, আমরা স্থানীয় লোক। লকডাউন শেষ হলেও আমাদের এলাকায় থাকতে হবে। এখন যেভাবে হুমকি পাচ্ছি, তাতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। লকডাউনের পর বিষয়টি কোনদিকে যায় বুঝতে পারছি না।

ওয়ারী উচ্চ বিদ্যালয়ে স্থাপিত লকডাউন কন্ট্রোল রুমে সমন্বয়ক নূরুল ইসলাম নাঈম জানান, লোকজন যা চায়, তাই তাদের সরবরাহ করা হয়। কিন্তু রাত ২টার দিকে যখন কেউ ফোন করে লেবু, ধনিয়াপাতা বা কোল্ড ড্রিংকস চান তখন খুব খারাপ লাগে। লকডাউন বাস্তবায়নের জন্য গভীর রাতে আমরা সেসবও সরবরাহ করছি। তিনি বলেন, আমরা চাই লকডাউন সফল হোক। তিনি আরও জানান, এটি একটি ব্যবসায়ী এলাকা। তাই সবাই বাইরে যেতে চান। এ নিয়ে স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে এলাকাবাসীর মাঝে-মধ্যেই সমস্যা হয়। শুরুতে বেশি ঝামেলা হতো। এখন অনেকটা কমে এসেছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে বাইরে যেতে দেয়া হচ্ছে না।

স্থানীয় ওষুধ বিক্রেতা মো. শরিফ জানান, লকডাউনের কারণে খুব লোকসানে পড়ে গেছি। মানুষ বের হতে পারছেন না। দিনে ৫০০ টাকার ওষুধও বিক্রি করতে পারছি না। লিলি স্টোরের বিক্রেতা সাইফুল ইসলাম জানান, এই দোকানের মালিক তার দুলাভাই। লকডাউনের কারণে দোকানের বিক্রেতারা সবাই চলে গেছেন।

তাই পাঁচ দিন আগে আমি কিশোরগঞ্জ থেকে এসে তাকে সহযোগিতা করছি। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত দোকান চালাই। কিন্তু বেচাকেনা নেই বললেই চলে। রাস্তায় মানুষ নেই। স্থানীয় সত্যদাস খোকন জানান, আমি বারডেম হাসপাতালে মেডিকেল এটেনডেন্ট হিসেবে কাজ করি। প্রতিদিন এন্ট্রি করে যাওয়া-আসা করি। আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না।

নিরাপত্তাকর্মী ওমর ফারুক জানান, সরকার ভালোর জন্যই লকডাউন দিয়েছে। কিন্তু এখানে শুধু বড়লোক নয়, গরিবরাও যে থাকেন- সে বিষয়টি কেউ খেয়াল করেননি। তিনি বলেন, এখানে দুই শতাধিক নিরাপত্তাকর্মী আছেন। তারা রাতভর ডিউটি করেন। কিন্তু তাদের জন্য কোনো চায়ের ব্যবস্থা নেই। স্বেচ্ছাসেবকরা বড়লোকদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করছেন কিন্তু আমাদের দিকে খেয়াল করছেন না।

হট কেকের গলিতে স্বেচ্ছাসেবক সাবরুল হাদান তমু বলেন, যারা সিরিয়াস কাজে বাইরে যেতে চান আমরা শুধু তাদেরই যেতে দিচ্ছি। বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে যাদের যুক্তি সিরিয়াস মনে হচ্ছে না তাদের পাঠিয়ে দিচ্ছি কন্ট্রোল রুমে।

কন্ট্রোল রুমের অনুমতি থাকলে কাউকে আটকানো হচ্ছে না। তিনি বলেন, প্রথমদিকে লকডাউন নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ছিল। এখন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটা পজিটিভ হয়েছে।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: নিরাপত্তা সতর্কতা!!!