পাটশিল্পের লোকসান রোধের উদ্যোগ, ‘গোল্ডেন হ্যান্ডশেকে’ ২৫ হাজার শ্রমিক

image-319987-1593200537.jpg

পাটশিল্পের লোকসান রোধে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিককে সর্বশেষ মজুরি কমিশন অনুযায়ী সব পাওনা পরিশোধ করে ‘বিদায়’ (গোল্ডেন হ্যান্ডশেক) দিতে যাচ্ছে সরকার। ২০১৫ সালের মজুরি কমিশন মেনে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশন (বিজেএমসি) তাদের পাওনা বুঝিয়ে দিতে যাচ্ছে। তবে বিদায় হওয়া এসব শ্রমিক একই প্রতিষ্ঠানে দৈনিক, ঘণ্টা ও উৎপাদনভিত্তিতে কাজ করার সুযোগ পাবেন।

আট বছরে পাটশিল্পে সরকারের লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে চার হাজার কোটি টাকারও বেশি। এ বিপুল পরিমাণ লোকসান রোধ করতেই সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে। তবে সরকারের এ সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সিবিএ-নন সিবিএ সংগ্রাম ঐক্য পরিষদ।

সূত্র জানায়, ২০১৫ সালের মজুরি কমিশন অনুযায়ী একজন শ্রমিককে বিদায় করতে হলে তাকে একসঙ্গে পাঁচ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হতে পারে। এ টাকা বিভিন্ন কাজে বা ব্যবসায় বিনিয়োগ করে তিনি আয় করতে পারবেন। পাশাপাশি যোগ্যতা অনুযায়ী একই প্রতিষ্ঠানে দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করেও সংসার চালাতে পারবেন। তাদের বিনা বেতনে না খেয়ে আর আন্দোলন করতে হবে না। পক্ষান্তরে সরকারকেও আর লোকসান গুনতে হবে না।

এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী (বীরপ্রতীক)। বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, ‘পাটশিল্পে সরকারের লোকসান ঠেকাতে পাটকলগুলোর স্থায়ী শ্রমিকদের দেনা-পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে বিদায় করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন, পরে এগুলো পিপিপি বা বিকল্প উপায়ে চালু করা হবে। আপাতত পাটশিল্পের লোকসান কমাতে এ পথেই যেতে হচ্ছে।’

কোনো শ্রমিক অন্যায়ের শিকার হবেন না আশ্বাস দিয়ে পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী পাট শ্রমিকদের বিষয়ে খুবই সহনশীল। প্রাপ্য অনুযায়ী তাদের দেনা-পাওনা বুঝিয়ে দিতে প্রয়োজনীয় সবই তিনি করবেন। এ নিয়ে শ্রমিকদের উদ্বেগ বা চিন্তার কিছু নেই।’

পাটকলগুলোর শ্রমিক নেতারা সরকারের এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে গোলাম দস্তগীর বলেন, অতীতেও তারা সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন, আগামীতেও হয়তো করবেন। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে। প্রয়োজনে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

লোকসান কমানো ও পাটশিল্প রক্ষায় আন্তঃমন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিজেএমসির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মো. আবদুর রউফ।

তিনি বলেন, লোকসানের কারণে পাটকলগুলোর খুবই বাজে অবস্থা। ২০১৪ সালের পর ৯ হাজার শ্রমিক অবসরে গেছেন, তাদের কাউকে পাওনা পরিশোধ করা হয়নি। শুধু তাদের পাওনাই এক হাজার কোটি টাকার ওপরে। এ টাকা দেয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। আমরা হিসাব-নিকাশ করছি মোট কত হাজার কোটি টাকা দরকার। লোকসান কমাতে আমরা স্থায়ী শ্রমিকদের পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে সম্মানজনকভাবে বিদায় জানাতে চাই। তারা ইচ্ছা করলে যোগ্যতা অনুযায়ী একই পাটকলে দৈনিক ভিত্তিতে কাজও করতে পারবেন। সেই সুযোগও থাকবে।

সরকারের এ সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সিবিএ-নন সিবিএ সংগ্রাম ঐক্য পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজশাহীর প্লাটিনাম জুট মিলের সিবিএ সভাপতি শাহানা শারমিন।

তিনি বলেন, শুনেছি সরকার পাটকল বন্ধ করে দিয়ে পাটকল শ্রমিকদের দেনা-পাওনা পরিশোধ করবে। পরবর্তীতে পিপিপির মাধ্যমে পাটকলগুলো চালু করবে। আমরা এটা মানি না। বিষয়টি নিয়ে আমরা দু’একদিনের মধ্যে বৈঠকে বসব। সেখানে এ বিষয়ে আমাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

জানা গেছে, বর্তমানে বিজেএমসির অধীন রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকলে স্থায়ী শ্রমিক আছে ২৪ হাজার ৮৬৬ জন। বদলি তালিকাভুক্ত শ্রমিক ২২ হাজার ৯৯৮ জন। দৈনিক ভিত্তিক তালিকাভুক্ত শ্রমিক চার হাজার ৯১০ জন। এসব মিলে বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে কাজ করে ২৭ হাজার ৯৫৭ জন শ্রমিক। এসব শ্রমিকের জন্য ২০১৫ সালের মজুরি কমিশন গঠিত হলেও তা এখনও বাস্তবায়ন করা হয়নি।

২০১০ সালের বেতন কাঠামোতেই তারা বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। এরপরও মাসের পর মাস বেতন বাকি পড়ে থাকছে। আট বছরে পাটকলগুলোর লোকসানের পরিমাণ চার হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে ২০১১-১২ অর্থবছরে বিজেএমসির লোকসান ছিল ৭৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৩৯৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৫১৩ কোটি ৮ লাখ টাকা, পরের অর্থবছরে ৭২৯ কোটি টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৬৬৯ কোটি ২০ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে।

এছাড়া ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪৮১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪৯৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৫৭৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।

জানা গেছে, এ লোকসানের কিছু কারণ চিহ্নিত করেছে বিজেএমসি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- ক. ২০০৯-২০১২ সাল পর্যন্ত তিন বছরে মিলগুলোর সেটআপের শূন্যপদের বিপরীতে তিন ধাপে ৩০ শতাংশ করে মোট ৯০ শতাংশ শ্রমিক স্থায়ী করায় মজুরি বৃদ্ধি পায়। খ. একই সময় প্রয়োজন ছাড়াই ছাঁটাই করা সাড়ে চার হাজার শ্রমিককে পুনঃনিয়োগ দেয়া হলে মজুরি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। গ. ২০১০ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন মজুরি কমিশন কার্যকর করা হলে মজুরি আগের তুলনায় ৬৭ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ঘ. বেসরকারি মিলগুলোর সর্বনিম্ন মজুরি পাঁচ হাজার ১৫০ টাকা (বেসিক ২৭০০ টাকা), অন্যদিকে সরকারি পাটকলগুলোর শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি ১১ হাজার ৮৫ টাকা (বেসিক ৪১৫০ টাকা)। চ. ৫০ দশকের পুরনো মেশিনের কারণে উৎপাদন ক্ষমতা ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। ছ. নিয়মিত শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ না করতে পারার কারণে পাটকলগুলোর গেটে ঘন ঘন মিটিং, ধর্মঘট ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে দিন দিন লোকসানের পরিমাণ বাড়ছে।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: নিরাপত্তা সতর্কতা!!!