স্কুলছাত্রকে পিটিয়ে বাবাকে পুলিশে দিলেন কৃষি কর্মকর্তা

nilphari-20220622194121.jpg

ডেস্ক রিপোর্ট : নীলফামারীর ডোমার উপজেলায় সিয়াম আহমেদ (১২) নামে এক স্কুলছাত্রকে মাটিতে ফেলে বুকে লাথি ও বেধরক মারধরের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আনিছুজ্জামানের বিরুদ্ধে। এ সময় স্থানীয়রা ওই শিশুকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করান।

মারধরের শিকার সিয়াম আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী ও ছোটরাউতা ডাঙ্গাপাড়া এলাকার মোফাজ্জল হোসেন মোফার ছেলে।

এদিকে ভুক্তভোগী স্কুলছাত্রের বাবা তার ছেলেকে মারধরের কারণ জানতে উপজেলা পরিষদে কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয়ে গেলে সেখানে কৃষি কর্মকর্তার সাথে বাকবিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। পরে সোমবার (২০ জুন) রাতে কৃষি কর্মকর্তা সিয়ামের বাবাসহ ৬ জনের নাম উল্লেখ করে সরকারি কাজে বাধা ও অফিস ভাঙচুরে অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনায় ওই স্কুলছাত্রের বাবাসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।

ভুক্তভোগী স্কুলছাত্রের পরিবার ও স্থানীয়রা জানান, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আনিছুজ্জামানের ছেলে উপজেলা আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণির ছাত্র রাহাদ আহমেদ মৃন্ময়ের সাথে একই বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির ছাত্র সিয়াম আহমেদের খেলার মাঠে সাইকেল চালানোকে কেন্দ্র করে ঝগড়া বাধে। ঝগড়ার এক পর্যায়ে দুইজনের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। বিষয়টি মৃন্ময়ের মা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার স্ত্রী দেখতে পেয়ে মাঠে গিয়ে স্কুলছাত্র সিয়ামকে মারধর করে টেনে-হিঁচড়ে তাদের কোয়ার্টারের দিকে নিয়ে যায়।

এক পর্যায়ে তিনি তার স্বামীকে ফোন করে অবগত করলে কৃষি কর্মকর্তা মো. আনিছুজ্জামান অফিস থেকে বেরিয়ে এসে উত্তেজিত হয়ে তাদের কোয়ার্টারের সামনে এসে সিয়ামকে মারধর ও তার বুকে লাথি মারতে থাকেন। মারধরের ঘটনার সময় মাঠে থাকা শিক্ষার্থীরা এগিয়ে এসে কারণ জানতে চাইলে ওই কৃষি কর্মকর্তা তাদেরও মারধর করেন। এ সময় স্থানীয়রা সিয়ামকে উদ্ধার করে ডোমার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করায়।

পরে ওইদিন সন্ধ্যায় সিয়ামের বাবা মোফাজ্জল হোসেন মাঠে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে নিয়ে উপজেলা পরিষদে কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয়ে যান এবং কৃষি কর্মকর্তার কাছে ছেলেকে মারধরের কারণ জানতে চাইলে উভয়ে তর্ক-বির্তকে জড়িয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে সেখানে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য থানায় খবর দেওয়া হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

পুলিশ এ সময় সিয়ামের বাবা মোফাকে আটক করে। পরে রাতেই কৃষি কর্মকর্তা আনিছুজ্জামান বাদী হয়ে ৬ জনের নাম উল্লেখ করে ও কয়েকজনকে অজ্ঞাত করে সরকারি কাজে বাধা, অফিসে ঢুকে কর্মকর্তাকে লাঞ্চিত করার অভিযোগে থানায় মামলা করেন।

ভুক্তভোগী স্কুলছাত্রের মা স্বপ্না আক্তার বলেন, আমার ছেলে সিয়াম দীর্ঘদিন থেকে অসুস্থ। তার খাদ্যনালি চিকন হয়ে গেছে। ৫ম শ্রেণিতে পড়লেও অসুস্থ থাকার কারণে তাকে খাৎনা (মুসলমানি) দেওয়া যায়নি। অপারেশনের জন্য দ্রুত ভারতে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। আমার ছেলে ভুল করলে তিনি আমাকে জানাতে পারতেন। আমি তাকে শাসন করতাম। কিন্তু তিনি এসে আমার অসুস্থ ছেলের বুকে লাথি মারেন।

তিনি বলেন, একজন দায়িত্বশীল অফিসার হয়ে এমন জঘন্য কাজ কীভাবে করেন তিনি? আবার উল্টো তিনি আমার স্বামীসহ এলাকার লোকজনের নামে মিথ্যা ঘটনা সাজিয়ে মামলা দিয়েছেন।

প্রত্যক্ষদর্শী মুন্না ইসলাম জানান, আমি অফিসার স্যারের কাছে সিয়ামকে কেন মারছেন জানতে চাইলে তিনি আমার কলার চেপে ধরে উপজেলায় কোনো ডাঙ্গাপাড়ার লোক আসতে পারবে না বলে হুমকি দেন।

ডোমার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত ডা. নাহিদা বলেন, শিশুটি গায়ে ও বুকে আঘাতের চিহৃ রয়েছে। শিশুটিকে বর্তমানে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে সে সুস্থ্য আছে।

স্কুলছাত্র সিয়াম বলে, আমি বিকেলে সাইকেল নিয়ে মাঠে গেলে আমাকে দেখে মৃন্ময় (১১) বলে যারা সাইকেল চালায় তারা মেথর। তাদেরকে কেউ দেখতে পায় না। তখন আমি বললাম আমি তো সাইকেল চালাই, তাই বলে আমি কি মেথর? মৃন্ময় ভালো হয়ে যাও বলায় সে আমাকে মারধর করে, আমিও গায়ে হাত তুলি। পরে আন্টি এসে আমাকে মারতে মারতে তাদের বাসার সামনে নিয়ে যান।

পরে আন্টি আঙ্কেলকে ফোন দিলে তিনিও এসে আমাকে মারেন এবং মাটিতে ফেলে আমাকে বুকের ওপরে পা তুলে দেন। আমি
আঙ্কেলকে জোড়হাত করে বলি, আঙ্কেল আমার ভুল হয়ে গেছে আমাকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু উনি মারতেই থাকেন।

এ ব্যাপারে ডোমার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আনিছুজ্জামানের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। তাছাড়া এটি ডোমার উপজেলা পরিষদের বিষয়। তারা বসে হয়তো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রমিজ আলম বলেন, স্কুলছাত্র সিয়ামকে মারধরের বিষয়টি জানা নেই। সোমবার সন্ধ্যায় অফিসে এসে কিছু লোক হামলা করে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে ডোমার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় দুইজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top