খুলনার শাপলা ক্লিনিক যেন মৃত্যুপুরি

image-1.jpg

শাপলা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, পাইকগাছা, খুলনা।

নিজস্ব প্রতিবেদক : খুলনার পাইকগাছা উপজেলায় শাপলা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার নামে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় একের পর এক রোগী মৃত্যুর ঘটনা ঘটেই চলেছে। এসব ঘটনার পর কিছুদিন ক্লিনিকটি বন্ধ থাকে। পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ‘ম্যানেজ’ করে আবার চালু করা হয়। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ চিকিৎসা খরচের ব্যয়ভারের কথা চিন্তা করে না বুঝেই সেখানে চিকিৎসা নিতে গিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন। অনভিজ্ঞ চিকিৎসকের হাতে অহরহ রোগী মারা যাচ্ছে। স্থানীয়রা ক্লিনিকটিকে মৃত্যুপুরি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

সর্বশেষ গত শনিবার (১৯ জুন) ভুল চিকিৎসায় সাত বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে সেখানে। এ নিয়ে গত তিন বছরে ওই ক্লিনিকে প্রসূতি ও শিশুসহ ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু হয়েছে সাত জনের।

সূত্র অনুযায়ি, ২০১৯ সালের ৮ অক্টোবর থেকে ১১ অক্টোবর তিন দিনের ব্যবধানে দুই প্রসূতির মৃত্যু ঘটে। সে সময় রোগীর স্বজন ও স্থানীয়রা ওই ক্লিনিকে ভাংচুর চালায়। ঘটনার পর ক্লিনিক ফেলে সকলেই পালিয়ে যায়। সে সময় স্থানীয় প্রশাসন ক্লিনিকটি বন্ধ করে দেয়।

এর আগে ২০১৮ সালের ১৯ মার্চ পাইকগাছার মৌখালি গ্রামের গৃহবধূ আরিফা খাতুনের এ্যাপেন্ডিস অপারেশন করতে গিয়ে তার মূত্রনালি কেটে ফেলা হয়। এতে রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। একই বছর উপজেলার চাঁদখালি গ্রামের এক দিনমজুরের মৃত্যু ঘটে ভুল চিকিৎসায়। ওই সময়ও স্থানীয়দের আপত্তির মুখে ক্লিনিকটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরবর্তিতে একই পন্থায় ক্লিনিকটি ফের চালু করা হয়।

গত ১৯ জুন ক্লিনিকে চিকিৎসকের অবহেলায় আবু সু‌ফিয়ান (৭) নামের এক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে।

এলাকাবাসী জানায়, ক্লিনিকটি ভাড়া করা ডাক্তার দিয়ে চলে। অপারেশনের পর অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরবর্তী চিকিৎসা না দিয়েই রোগী ফেলে চলে যান ডাক্তাররা। এ কারণে প্রতিনিয়তই সেখানে দূর্ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ গত শনিবার আবু সুফিয়ান নামে যে শিশুর মৃত্যু হয়েছে তার অপারেশান করেছিলেন ফারুক নামে একজন ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালক। তিনি বিপিন বিহারি নামে একজন চিকিৎসককে বিভিন্ন ক্লিনিকে আনা-নেওয়ার কাজ করতেন। এ ঘটনার পর রোগীর স্বজন ও স্থানীয় মানুষের বিক্ষোভের মুখে প্রশাসন ক্লিনিকটি সীলগালা করে দেয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলেও মোটর সাইকেল চালক ফারুক একজন চিকিৎসকের সহকারি হিসেবে কাজ করতেন। ওই চিকিৎসক যখন কোন রোগীর অপারেশন করতেন সে সময় ফারুককে সাথে রাখতেন। ফারুক দেখে দেখে সব কিছু আয়ত্ব করে নিতেন। কিছুদিন পরে তাকে দিয়ে ছোটখাটো অপারেশন করা হতো। এভাবে এক সময় মোটর সাইকেল চালক ফারুক নিজেই সব অপারেশন করা শুরু করেন। প্রথম দিকে একজন অবসরপ্রাপ্ত সিভিল সার্জনের উপস্থিতিতে তিনি এ কাজ করতেন। পরে তিনি একাই ঝুঁকি নিয়ে অপারেশন করা শুরু করেন। অভিযোগ রয়েছে শাপলা ক্লিনিকের সব অপারেশন ফারুককে দিয়েই করা হয়। এছাড়া ওই ক্লিনিকের মালিক তাপস মিস্ত্রিও অপারেশন করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

কিছুদিন আগে কয়রা উপজেলার হরিনগর গ্রামের নুরজাহান বেগম নামে এক গৃহবধূর পেটে ব্যাথা হলে ওই ক্লিনিকে নিয়ে আসে তার স্বজনরা। এ সময় ক্লিনিকে চিকিৎসক আছে কিনা জানতে চাইলে তাপস মিস্ত্রি নিজেকে চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দেন। পরে রোগীর স্বজনরা খোঁজ খবর নিয়ে ক্লিনিক থেকে রোগী বের করে নিয়ে আসেন।

ক্লিনিকে চিকিৎসকের অবহেলায় মৃতু শিশুর মা-বাবার আহাজারি। ১৯ জুন, পাইকগাছা, খুলনা।

ক্লিনিকের মালিক তাপস মিস্ত্রির কাছে এসব বিষয়ে জানতে তার ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সংবাদকর্মী আলাউদ্দীন হোসেন বলেন, ক্লিনিকটির বৈধ কোন কাগজপত্র নেই। নিয়মিত কোন চিকিৎসকও থাকে না। তারপরও ক্লিনিকটি চলছে। ক্লিনিকটিতে একের পর এক রোগী মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও কিছুদিন বন্ধ থাকার পর আবার চালু হয়। আমরা এ ধরনের ক্লিনিক বন্ধের দাবী জানিয়ে আসছি। কিন্তু অজ্ঞাত কারনে আমাদের দাবী উপেক্ষিত হচ্ছে।

পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম খালিদ হোসেন সিদ্দিকি বলেন, সম্প্রতি ক্লিনিকটিতে অভিযান চালিয়ে বৈধ কাগজপত্র না থাকায় জরিমানা আদায়সহ ক্লিনিক সীলগালা করে দেওয়া হয়েছে।

খুলনার সিভিল সার্জন ডাঃ নিয়াজ মোহাম্মাদ বলেন, ওই ক্লিনিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েছি। ক্লিনিকটির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রক্রিয়া চলছে।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top
error: নিরাপত্তা সতর্কতা!!!