দিন কেটে গেছে বৈশাখী মেলায় ঘুরে ঘুরে: হামিদুজ্জামান খান

Untitled-1-267.jpg

ডেস্ক রিপোর্ট : হামিদুজ্জামান খানের পড়াশোনার বিষয় চিত্রকলা হলেও উচ্চতর শিক্ষা নিয়েছেন ভাস্কর্য নির্মাণে। ফলে তিনি ভাস্কর্য ও চিত্রকলা দুই মাধ্যমেই কাজ করছেন। এই শিল্পীর ৩৬টি একক প্রদর্শনী হয়েছে। ‘পাখি পরিবার’, ‘সংশপ্তক’, ‘কিংবদন্তি’ তাঁর অন্যতম ভাস্কর্য। শিল্পকলা একাডেমি থেকে পেয়েছেন চারটি পুরস্কার। ২০০৬ সালে পেয়েছেন একুশে পদক। বহুমাত্রিক এই শিল্পীর নববর্ষ উদযাপন প্রসঙ্গে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলোকচিত্রী

মোহাম্মদ আসাদমোহাম্মদ আসাদ: আপনার শৈশবে বৈশাখের প্রথম দিন কীভাবে কেটেছে?

হামিদুজ্জামান খান: আমার ঠিক মনে নেই দিনটি কীভাবে কেটেছে। তবে মেলায় গিয়েছি। অনেক সময় দিন কেটে গেছে মেলায় ঘুরে ঘুরে। মেলা থেকে কিছু কেনার চাইতে ঘুরে ঘুরে নানা রকম খেলনা দেখার আনন্দ ছিল অনেক বড়। তখন বৈশাখে মানুষের গোলা ভলা ধান থাকত। মনে আনন্দ ছিল। গাছ ফলে ভরে থাকত। তখন মানুষের মনে এমনিতেই আনন্দ থাকত। সেই সময় বৈশাখের পরিবেশটাই ছিল আনন্দের।

মোহাম্মদ আসাদ: সেই সময়ে মেলা কেমন ছিল?

হামিদুজ্জামান খান: বৈশাখে আমাদের বাড়ির পাশেই একটা মেলা হতো। ঢোলের শব্দ জানান দিত মেলা এসেছে। ছোটবেলায় আমরা গিয়ে মেলায় উপস্থিত হতাম। একটা বকুল গাছের নিচে খাচায় ভরে পাখি দিয়ে আসত মেলায়। মেলায় আরো আসত প্রচুর টেপাপুতাল। এটা ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী পুতুল। এই অঞ্চলে আদি পুতুলগুলো ছিল অসাধারণ। আমার শৈশবে এসব খুব ভালো লাগত।

মোহাম্মদ আসাদ: আর কোন মেলা হতো আপনাদের এলাকায়?

হামিদুজ্জামান খান: আরেকটা মেলা হতো কুড়িগাই এলাকায়। এটা ছিল আমাদের বাড়ি থেকে একটু দূরে। একটা মাজারকে কেন্দ্র করে বিশাল এই মেলাটা হতো। যদিও এটা হতো পৌষ সংত্রান্তিতে। স্কুল জীবনে আমি সেখানে অনেক গিয়েছি। হেঁটে যেতাম। ট্রেনেও যাওয়া যেত। এই মেলার সময় ট্রেন আর দেখা যেত না। ট্রেনের উপরে দরজায় জানালায় মানুষ আর মানুষ।

ট্রেনটা যখন চলত তখন মনে হতো শুধু মানুষ যাচ্ছে। মেলায় আসত মজার মজার মিষ্টি খাবার। আর আসত ফার্নিচার। সেই সময় এলাকার সবাই চিড়া-মুড়ি তৈরি করত। প্রতিটি ঘরে ঘরে চিড়া-মুড়ি তৈরির ধুম পরে যেত। আর হতো পাকন পিঠা (নকশী পিঠা)। শৈশবে আমার মাকে দেখেছি পিঠার নকশা করতে। খেজুর পাতা দিয়ে কেটে কেটে নকশা করত। কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের পাকন পিঠার সুনাম আছে।

মোহাম্মদ আসাদ: ঢাকায় এসে বাংলা নববর্ষ কেমন দেখলেন?

হামিদুজ্জামান খান: এই যে মঙ্গল শোভাযাত্রা এটা আমাদের চোখের সামনেই শুরু হলো। বিগত শতাব্দির আশির দশকের শেষের দিকে মঙ্গল শোভাযাত্রার শুরু। তারপর নিয়মিত এই শোভাযাত্রার আয়োজন হয়ে আসছে। মঙ্গল শেভাযাত্রা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। বিষয়টা বাঙালির জন্যই আনন্দের। আমি কখনও এই কাজে অংশগ্রহণ করিনি। কাছে বসে থাকতাম, অন্যদের কাজ দেখতাম। তবে শিক্ষক হিসেবে এই কমিটিতে অনেক বার ছিলাম। মঙ্গল শোভাযাত্রার কাজ না করলেও এর তহবিল সংগ্রহের জন্য ছবি এঁকে দিয়েছি প্রতিবছর।

এ বছরও দুইটা ছবি এঁকে দিয়েছি। আমি যখন ভারতের বরোদায় পড়াশোনা করেছি তখন দেখেছি মেলা হয়। সেই মেলাতে আমরা পার্টিসিপেট করেছি। আমরা যেহেতু ভাস্কর্যের, সেহেতু মেটালের ছোট ছোট উপকরণ তৈরি করে দিতে বলেছে। কিন্তু আমি বলেছি ছবি আঁকব। পরে ১০-১২টা ওয়াটার কালার করলাম। এক ভদ্রলোক এসে সব কিনে নিলেন। আমার শিক্ষকরা বলল- ও তো আঁকে ভালো, ওকে আমরা নষ্ট করলাম নাকি!

মোহাম্মদ আসাদ: শোভাযাত্রায় অংশগ্রহন করেছেন কখনো?

হামিদুজ্জামান খান: চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা কিন্তু সব সময়ই পপুলার। শোভাযাত্রায় অংশগ্রহনের জন্য পহেলা বৈশাখের দিন সকালেই মানুষ ভরে যায়। আমি তো চারুকলায়ই থাকতাম। চারুকরার ভিতরে একটা হোস্টেলের দায়িত্বে ছিলাম আমি। তখন তো বষয় ছিল কম। আমি আমার স্ত্রী আইভিকে নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেছি। মুখোশ পরে ঢাকের তালে তালে শোভাযাত্রার সঙ্গে ঘুরে আসতাম। প্রথমে স্পন্সর নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন হতো। বড় একটা কমিটি হতো। খ্যাতিমান সবাই যোগ দিতেন।

আরও পড়ুন : গুতেরেসের সঙ্গে ইউক্রেন-জেরুজালেম নিয়ে এরদোগানের আলোচনা

শিল্পী ইমদাদ হোসেন, মুস্তাফা মনোয়ার আসতেন। সবাই মিলে ১০১ জনের একটা বড় কমিটি হতো। পরে দেখা গেল মঙ্গল শোভাযাত্রা স্পন্সরের মেলায় পরিণত হয়েছে। এরপর নিজেদের আয়োজনে মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হলো। এখানে চারুকলার বর্তমান ডিন নিসার হোসেনের অবদান অনেক। এই আয়োজনে অনেক টাকা লাগে। সে নানাভাবে এই অর্থ সংগ্রহ করে বড় এই আয়োজনকে সফল করে তুলেছে। মঙ্গল শোভাযাত্রায় আমাদের ঐতিহ্যবাহী লোকজ ফর্মগুলো বড় আকারে তৈরি করা হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রায় আনন্দ করলেও এসব তৈরিতে আমি কখনও উৎসাহ বোধ করিনি।

মোহাম্মদ আসাদ: আপনার কাজে কি লোক-ঐতিহ্যের প্রভাব আছে?

হামিদুজ্জামান খান: অবশ্যই আছে। এগুলো তো ছোটবেলার স্মৃতি। ময়মনসিংহ অঞ্চল টেপাপুতুল আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। এই অঞ্চলের পুতুল, নকশি পিঠার নকশা দেখে আসছি ছোটবেলা থেকে। এই অঞ্চলে পিঠার নকশা কিন্তু ইউনিক। এর প্যাটার্নটাই ইউনিক। বিদেশি এক লেখক আমাদের এলাকার পিঠা, পুতুলের উপর লিখেছিলেন। এগুলো আন্তর্জাতিকভাবে কাউন্ট হওয়ার মতো বিষয়।

আমরা আফ্রিকান মুখোশ দেখি ইউনিক। এটা তো সরাসরি ব্যবহারের জন্য নয়। রিচুয়ালের জন্য প্রচলন হয়েছে। আমাদের পুতুল-পিঠা উৎসবের প্রয়োজনে এসেছে। এটা আনন্দের জন্যই করে। বিশেষ করে পিঠা বানানো থেকে খাওয়া পর্যন্ত আনন্দ লেগে থাকে। এটা কিন্তু পেট ভরার জন্য নয়। এর ভেতর সৌন্দর্যবোধ আছে। যেহেতু আমি কিশোরগঞ্জে জন্মেছি। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের বাড়ি ময়মনসিংহের হলেও জন্ম কিশোরগঞ্জে। আবেদিন স্যারের কাছে সেই এলাকার টেপাপুতুলের ফর্ম পাওয়া যায়।

মোহাম্মদ আসাদ: আপনার কাজে কি লোকজ ফর্ম পাওয়া যায়?

হামিদুজ্জামান খান: আমার ভাস্কর্যে কিন্তু অর্গানিক ফর্মগুলো আছে। কার্ভ লাই, এটা কিন্তু পুতুলে আছে। লোকজ ফর্ম আমার কাজে সরাসরি পাবে না। ইনডাইরেক্টলি আছে। আমার স্টোনের কাজে আছে। আমার ভাস্কর্যে কার্ভ লাইন অনেক আছে। আমার পেইন্টিং মুখোশে কার্ভ লাইন আছে।

মোহাম্মদ আসাদ: পহেলা বৈশাখ বাংলার গ্রামগঞ্জের মানুষের প্রাণের উৎসব। সেটা শহরে এসে নতুন ভাবে প্রচলন হলো। সে উৎসব পেল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

হামিদুজ্জামান খান: আমরা কিন্তু ভাষার জন্য রক্ত দিয়ে একটি দিবস পেয়েছি, মাতৃভাষা দিবস। ইউনেস্কোর স্বীকৃতিও পেয়েছি। আমাদের সুন্দরবনও কিন্তু ইউনেস্কোরস্বীকৃতিপ্রাপ্ত। এগুলোর কিন্তু মূল্য আছে। আমাদের  অনেক কিছু আছে। আমাদের পাহাড়পুরের পুরনো ডিজাইনে অসাধারণ কাজ। পৃথিবীর সেরা ঐতিহ্যগুলোর চেয়ে এটা কোনো অংশেই কম নয়। এরপর কিন্তু অনেক দেশে বৌদ্ধ ধর্ম বিস্তার লাভ করেছে। কিন্তু আামাদেরটা অনেক আগে। মঙ্গল শোভাযাত্রা ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ করেছে। এটা অবশ্যই গর্বের বিষয়।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top