করোনা মোকাবেলায় খুলনার যত প্রস্তুতি ও আমাদের যা প্রত্যাশা

92618338_677026686390288_713678686758371328_n.jpg

মিনা অছিকুর রহমান দোলন।

গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর থেকে উৎপত্তি হওয়া করোনা ভাইরাস এখন বিশ্বব্যাপী ক্রমেই মহামারি আকার ধারণ করছে। বিশ্বের ২০৯ টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এ প্রাণঘাতি ভাইরাস। এ ভাইরাসে সংক্রামিত হয়ে সারা বিশ্বে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ১৫ লক্ষাধিক মানুষ, আর এই প্রাণঘাতি ভাইরাসের সংক্রমনে এ পর্যন্ত প্রাণ কেঁড়ে নিয়েছে ৯০ হাজারেরও বেশি প্রাণ। দিন দিন বেড়ে চলেছে মৃত্যুর মিছিল। বিশ্বের পশ্চিমা দেশগুলি তথা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্সসহ করোনা সংক্রমন মোকাবেলায় দিশেহারা। করোনার প্রতিষেধক আবিস্কার নিয়েও বিনিদ্র রাত কাটাচ্ছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা।

গত মার্চের ৮ তারিখে বাংলাদেশে প্রথম করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। প্রথম রোগী সনাক্তের ৩১ দিনের মাথায় মোট আক্রান্ত ৩৩০ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ২১জন। শনাক্ত হওয়ামাত্র সংক্রমন প্রতিরোধে মন্ত্রী পরিষদের বৈঠকে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৭ মার্চ থেকে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সব ধরণের অফিস-আদালত বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ২ এপ্রিল তারিখে করোনা মোকাবেলায় জাতির উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী ভাষন প্রদান করেন। করোনা মোকাবেলায় তিনি নিয়মিত জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা প্রদান করছেন। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নির্দেশনা পালনে খুলনা জেলা প্রশাসনও পিছিয়ে নেই।

খুলনার রাজনীতিক ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সমন্বয়ে একাধিক বৈঠক সম্পন্ন ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে খুলনা জেলা প্রশাসন। করোনা সংক্রমনরোধে ঘরে থাকা অসহায় মানুষের মুখে খাদ্য সামগ্রী তুলে দিতে জোলা প্রশাসনের বিশেষ সেল খোলা হয়েছে। নির্ধারিত নাম্বারে ফোন করলেই অসহায় ঘরবন্দী পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে খাদ্য সামগ্রী। প্রশাসনের পাশাপাশি খুলনার বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এগিয়ে এসেছে এসকল ঘরবন্দী মানুষের মুখে খাবার যোগাতে। এগিয়ে এসেছে খুলনার জনপ্রতিনিধিবৃন্দ। খুলনা সিটি কর্পোরেশন, খুলনা জেলা পরিষদ, খুলনার বিভিন্ন আসনের সাংসদ এমনকি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন ওয়ার্ড পর্যায়ের নের্তৃবৃন্দও এগিয়ে এসেছেন এ কাজে।

খুলনা মেডিকেল কলেজে ৭ এপ্রিল মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে করোনাভাইরাস পরীক্ষা। খুমেক এর তৃতীয় তলায় মাইক্রোবাইলোজি বিভাগের ল্যাবে পলিমার চেইন রিঅ্যাকশন (পিসিআর) মেশিনের উদ্বোধন করেন খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক।
করোনা শনাক্তকরণ এ মেশিন দিয়ে একসাথে ৯৬টি নমুনা পরীক্ষা করে যাবে। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পরীক্ষা করা হবে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, খুলনা সদর হাসপাতাল এবং খুলনার ১০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আলাদা ফ্লু কর্ণার স্থাপন করা হয়েছে। ফ্লু কর্ণারের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রোগীর লক্ষণ ও উপসর্গ দেখে যাদের করোনাভাইরাস পরীক্ষা করা প্রয়োজন শুধুমাত্র তাদেরই নমুনা পিসিআর মেশিনে পরীক্ষা করা হবে। পিসিআর মেশিনে চার ঘন্টার মধ্যে পরীক্ষার ফলাফল জানা যাবে। পরীক্ষা সংক্রান্ত তথ্যাদি দ্রুত সময়ে ঢাকাস্থ আইইডিসিআর-এ প্রেরণ করে নিশ্চিত হয়ে ফলাফল জানানো হবে।

করোনাভাইরাস পরীক্ষার পর যারা পজিটিভ শনাক্ত হবেন তাঁদের করোনা বিশেষায়িত হাসপাতাল হিসেবে প্রস্তুত করা খুলনা ডায়াবেটিক হাসপাতালে আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হবে। ১৪টি আইসিইউ বেড সহ মোট আশিটি বেডের ব্যাবস্থা রয়েছে এখানে। ৬০ জন চিকিৎসক, ৬০ জন নার্স ও ৫০ জন কর্মকর্তা কর্মচারী নিযুক্ত করা হয়েছে। হোটেল ডি এস প্যালেস ও হোটেল অ্যাম্বাসেডর এ করোনা সাসপেক্টেড রোগী কোয়ারেন্টাইন এ থাকবে। এবং হোটেল রয়্যাল এ যে সকল চিকিৎসক রোগীর সংস্পর্শে এসেছে কোয়ারেন্টাইন থাকার প্রয়োজন হলে তারা ওই হোটেলে থাকবে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ইমার্জেন্সি ভাবে অন্যান্য সকল রোগের চিকিৎসা সেবা প্রদান করবে।

বুধবার থেকে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে ও সামাজিক দুরত্ব নিশ্চিত করতে গোটা খুলনা জেলায় সকল ধরনের যানবাহন প্রবেশ ও প্রস্থানে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে জেলা প্রশাসন। এছাড়াও খুলনায় দোকান, বাজার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সন্ধা ৭টার পর বন্ধ থাকবে মর্মে জনস্বার্থে এক গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে জেলা প্রশাসন। তবে ওষুধের দোকান, হাসপাতাল ও ক্লিনিক এই নির্দেশনার বাইরে থাকবে। রূপসা কাঁচাবাজার ও কেসিসি সান্ধ্যবাজার রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।

খুলনা সিটি কর্পোরেশন, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের বিশেষ গাড়ীর মাধ্যমে নগর জুড়ে ছিটানো হচ্ছে জীবানুনাশক রাসায়নিক। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরাও গোটা জেলার বিভিন্ন জায়গায় জীবানুনাশক স্প্রে ছিটাতেও দেখা গেছে।

সুখের কথা এই যে, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত খুমেক এ সম্পাদিত ৭৩টি পরীক্ষায় এখনও পর্যন্ত খুলনায় কোন করোনায় আক্রান্ত রোগী সনাক্ত হয়নি।
করোনা সংক্রমন প্রতিরোধে ও সামাজিক দুরত্ব নিশ্চিত করতে খুলনা জেলা প্রশাসনের বিশেষ দল নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য, কেএমপি ও জেলা পুলিশও বিশেষ ভুমিকা পালন করছে। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গোটা খুলনা করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধ হবে এটি হোক সকলের প্রত্যাশা।

লেখক: মিনা অছিকুর রহমান দোলন
সম্পাদক, সাপ্তাহিক খুলনার দর্পণ

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।