একাত্তরের দেখা মেলে খুলনার গণহত্যা জাদুঘরে

1971-pic.jpg

তরিকুল ইসলাম ডালিম: ১৯৭১এ নয় মাস ধরে চলা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর অর্জিত বিজয়ের পেছনে রয়েছে গণহত্যার এক নির্মম ইতিহাস। যার নমুনা যথাযথ সংরক্ষণ নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। সম্প্রতি একাত্তরের গণহত্যার ইতিহাস নতুন প্রজন্মসহ সবার সামনে তুলে ধরতে খুলনায় গড়ে তোলা হয়েছে ১৯৭১ গণহত্যা নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর। এটি শুধু বাংলাদেশেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ায়ও এ ধরণের প্রথম যাদুঘর। উদ্যোক্তরা বলছেন, নতুন প্রজন্মের মাঝে মুক্তিযুদ্ধ ও গনহত্যার বিষয় তুলে ধরে স্বাধীনতার চেতনা সমৃদ্ধ করতে এ উদ্যোগ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের গণহত্যার বিষয়ে আমস্টারডামের অ্যান ফ্রাংক জাদুঘরসহ অনেক দেশেই তৈরী হয়েছে গণহত্যা জাদুঘর। সেসব দেশের শিশুদের ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো হচ্ছে গণহত্যার ইতিহাস। হচ্ছে নতুন নতুন গবেষণাও।

কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বিজয়কে গুরুত্ব দিলেও ৩০লাখ মানুষের আত্নদান আর দুই লাখ মা-বোনসহ ৫লক্ষাধিক নারকীয় নিযার্তনের শিকার মুক্তিকামী মানুষের বিষয়ে আমাদের উদাসীনতা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের গণহত্যা ও নিযার্তনকে অবহেলার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ইতিহাস বিকৃতিও বেড়েছে। ফলে বিভ্রান্তি বাড়ছে নতুন প্রজন্মের মধ্যেও। দেশের মুক্তিযুদ্ধের সেই গণহত্যার ইতিহাস নতুন প্রজন্মসহ সবার সামনে তুলে ধরতে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সমৃদ্ধ কিছু মানুষের প্রচেষ্টায় ২০১৪ সালের ১৭ মে খুলনায় গড়ে তোলা হয়েছে দেশের প্রথম ১৯৭১ গণহত্যা নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর। এ জাদুঘরের সাথে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষনা কেন্দ্র।

পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বরাদ্ধ দেয়া খুলনা মহানগরীর ২৬, সাউথ সেন্ট্রাল রোডের সরকারী জমি ও বাড়িতে ২০১৬ সালের ২৬ মার্চে স্থায়ীভাবে জাদুঘরটি স্থানান্তরিত হয়। এরপর উদ্যোক্তাদের প্রচেষ্টায় সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সহায়তায় শুরু হয়েছে আধুনিকমানের গণহত্যা আর্কাইভ ও জাদুঘরের বহুতল ভবন নির্মান প্রকল্পের কাজ। বর্তমানে ১৯৭১ গণহত্যা আর্কাইভ ও জাদুঘর অস্থায়ীভাবে নগরীর সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকার ৬নং রোডে স্থানান্তর করা হয়েছে। সেখানেই চলছে গবেষনাসহ সকল কার্যক্রম। এ প্রকল্পের কাজ শেষ হলে এটিই হবে এশিয়ার প্রথম আধুনিক গনহত্যা আর্কাইভ ও জাদুঘর।

এ ব্যাপারে গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষনা কেন্দ্রের উপপরিচালক মো: রোকনুজ্জামান বাবুল বলেন, এখানে স্বাধীণতা-মুক্তিযুদ্ধ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি, গণহত্যার বিস্মৃত বধ্যভূমি ও গণকবর চিহ্নিতকরণ, গণহত্যা-নিযার্তনের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে অনলাইন ও অফলাইন আর্কাইভ, গণহত্যা-নিযার্তন নির্ঘণ্ট ও শহীদ স্মৃতিগ্রন্থ প্রকাশনা,আলোকচিত্র, অডিও-ভিডিও ক্লিপ আর দলিল সংরক্ষণ ও প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখানে প্রতিদিন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ দেখতে আসছেন। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মর্মদন্তু ইতিহাসের ভয়াবহ গনহত্যা ও নিযার্তনের ঘটনা অবহিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ হচ্ছে তরুন প্রজন্ম। ১৯৭১ গণহত্যা-নিযার্তন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাষ্টু, খুলনার সদস্য সচিব বাহারুল আলম বলেন, যারা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি সেই তরুন প্রজন্মের মাঝে মুক্তিযুদ্ধ ও গনহত্যার বিষয় তুলে ধরে স্বাধীনতার চেতনায় সমৃদ্ধ ভবিষ্যত প্রজন্ম গড়ে তুলতে এ উদ্যোগ।

সরকারীভাবে এ গণহত্যা আর্কাইভ ও জাদুঘরকে আত্নীকরন করে স্থায়ী রূপ দিতে সরকারের কাছে দাবী এ উদ্যোক্তার। যা একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে বিশেষ ভুমিকা রাখবে বলে মনে করছেন তিনি।

অপরদিকে খুলনা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা শেখ হারুনুর রশিদ দেশের প্রথম এ গণহত্যা নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘরের উন্নয়ন এবং স্থায়ী রুপ দিতে সব ধরনের প্রচেষ্টার কথা জানিয়ে বলেন, একমাত্র এ জাদুঘরের উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে ভারতের ত্রিপুরা সরকার একটি জাতীয় উদ্যান তৈরি, একটি ভাস্কয্য উদ্যান গড়ে তোলা এবং দেশে ২৪টি জেলার গণহত্যাস্থল বা বধ্যভূমিতে স্মৃতিফলক নির্মাণ ও গণহত্যা নিয়ে র্অধশতাধিক বই প্রকাশে সফল্ হয়েছে।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।