বিপদে রপ্তানি খাত

Untitled-22-5e72746e51f34.jpg

ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বাংলাদেশের শীর্ষ বাজারগুলোতে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় রপ্তানি খাত বড় ধরনের বিপদে পড়েছে। সবচেয়ে চাপে পড়েছে প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক। অনেক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান রপ্তানি অর্ডার বাতিল করছে। পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য খাতের রপ্তানিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেশের আমদানিও কমে গেছে। শেয়ারবাজারেও বড় পতন চলছে। সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে।

তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, করোনাভাইরাসের কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিক্রয়কেন্দ্র কিংবা শপিংমল বন্ধ রয়েছে। কোথাও কোথাও এক ধরনের জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। আমেরিকার অবস্থাও একই। ফলে ওই দুটি অঞ্চলে বিক্রি অনেক কমে গেছে। ভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকতে সেখানকার মানুষ খাবার, ওষুধের মতো প্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়া অন্যান্য পণ্য কিনছেন না। এ অবস্থায় যেসব কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে পোশাক নিয়ে যায়, তারা এখানকার উৎপাদকদের পণ্য তৈরিতে নিরুৎসাহিত করছেন। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান পোশাক কেনার চুক্তি বাতিল করছে। অনেক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বলছে, নতুন পণ্য তৈরি করতে হবে না। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান অর্ডার কমিয়ে দিচ্ছে। রপ্তানির এই পরিস্থিতির কারণে আমদানিও কমছে। কারণ বাংলাদেশে যে আমদানি হয়, তার বড় অংশ রপ্তানির কাঁচামাল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত জানুয়ারিতে আমদানি কমেছে ১৩ শতাংশ। আর জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে এলসি কমেছে ১৯ শতাংশ।
এ বছরের শুরুতে চীনে প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দেখা যায়। বর্তমানে এই ভাইরাস চীনের গণ্ডি পেরিয়ে ১৪০টির বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকা বর্তমান বিশ্ব থেকে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন। অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী ভারতও তাদের দেশে অন্য দেশের মানুষ ঢুকতে দিচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যও প্রায় বিচ্ছিন্ন। বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি হয় এমন অনেক দেশ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। কোনো কোনো দেশ ভিসা বন্ধ করেছে। সবকিছু মিলিয়ে ভাইরাসের সংক্রমণ দীর্ঘায়িত হলে পুরো বিশ্বে এক ধরনের মন্দার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে করোনার প্রভাব গভীর হচ্ছে। রপ্তানি আয়সহ সামগ্রিক অর্থনীতি আগে থেকেই চাপে ছিল। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রতি মাসেই কমছিল। সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় হচ্ছিল না। এ অবস্থায় করোনার ধাক্কা অর্থনীতিকে বড় ধরনের চাপে ফেলবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ীরা।

তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ড. রুবানা হক মঙ্গলবার বিকেলে বলেন, গত তিন ঘণ্টায় ২০টি কারখানা জানিয়েছে যে, তাদের ক্রেতারা ১০ মিলিয়ন ডলারের অর্ডার বাতিল করেছে। তার নিজের কারখানায় ২১ লাখ পিস পোশাকের অর্ডার বাতিল হয়েছে। একের পর এক অর্ডার বাতিলের খবর আসছে। এ পরিস্থিতিতে বিজিএমইএ অর্ডার বাতিল, স্থগিত ইত্যাদির তালিকা করছে।

তিনি বলেন, ক্রেতারা শ্রমিকদের স্বার্থ নিয়ে এত কথা বলেন, আর এখন কোনো ধরনের বিচার-বিবেচনা ছাড়াই অর্ডার বাতিল করছেন। ক্রেতারা বলছেন, পণ্য বানানোর দরকার নেই। এখন বন্ধ থাক। পরে দেখা যাবে। সামনে রমজান, ঈদ আসছে। এ মুহূর্তে অর্ডার বাতিল করলে কারখানাগুলো শ্রমিকদের বেতন-ভাতা কীভাবে দেবে, ব্যাংক ঋণ কীভাবে শোধ করবে- ক্রেতারা এসব কিছুই ভাবছেন না। তারা একেবারেই শীতের পাখির মতো আচরণ করছেন। এ অবস্থায় বিজিএমইএ সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলেছে। সবাই সর্বোচ্চ নীতি সহায়তা দেওয়ার কথা বলেছে। সরকার হয়তো সাধ্য অনুযায়ী পাশে থাকবে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, ইউরোপ-আমেরিকাসহ ক্রেতা দেশে বন্দর, বিমান যাতায়াত এবং বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ। মানুষ চলাচল, কেনাকাটা কিছুই করতে পারছে না। ফলে যারা বাংলাদেশ থেকে আমদানি করে, তারা আমদানি বন্ধ রেখেছে। তিনি জানান, তার কারখানার দুটি রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়েছে।

বিটিএমএর সাবেক সভাপতি এ মতিন চৌধুরী বলেন, প্রধান প্রধান রপ্তানি বাজারে দোকানপাট বন্ধ। ফলে ক্রেতারা পণ্য নিতে চাচ্ছেন না। অনেকে অর্ডার বাতিল করছেন। অনেকে স্থগিত করছেন। কেউ কেউ পণ্য পরে পাঠাতে বলছেন। অনেক ক্রেতা কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। সবমিলিয়ে খুবই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে রপ্তানি। এদিকে, কারখানার শ্রমিকদের বেতনসহ অন্যান্য খরচ অব্যাহত রয়েছে। কাঁচামাল আমদানির দায় সময়মতো পরিশোধ করা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থা কতদিন চলবে তার ওপর নির্ভর করছে রপ্তানি খাত কতটা ভুগবে। মতিন চৌধুরী জানান, তার কারখানার একটি অর্ডার সম্প্রতি স্থগিত হয়েছে। যে দেশে ওই পণ্য যাওয়ার কথা ছিল, সেখানকার বন্দরের কার্যক্রম সীমিত হওয়ায় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান পরে পণ্য পাঠাতে বলেছে।

শীর্ষস্থানীয় তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বার বলেন, ‘আমরা উদ্বিগ্ন। আমরা ১৮টি চেইন স্টোরের সঙ্গে কাজ করি। তারা ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন, অর্ডার কমাবে। একজন বড় ক্রেতা বলেছেন, ২০ শতাংশ অর্ডার কমাবেন। সবাই অর্ডার কমাবে। সুতরাং করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে সারাবিশ্বের যে পরিস্থিতি তাতে তৈরি পোশাক খাতে যে সংকট তৈরি হবে- তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

ইইউর দেশগুলোর মধ্যে জার্মানিতে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি রপ্তানি করে। দেশটি অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড ও স্পেনের সঙ্গে তাদের স্থল সীমান্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে। স্কুল, ডে-কেয়ার সেন্টার বন্ধ করার পাশাপাশি অন্যান্য অফিসের কর্মীদের বাড়িতে বসে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জার্মানিতে গত অর্থবছরে ৬১৭ কোটি ডলার রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। স্পেন ও ফ্রান্স জরুরি অবস্থা জারি করেছে। এখানকার দোকানপাটও বন্ধ। ইতালিতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। দেশটিতে প্রতিদিনই মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। সেখানে ওষুধ ও নিত্যপণ্যের দোকান ছাড়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই বন্ধ। যুক্তরাজ্যে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন ধরনের সতর্কতা। ফ্রান্স, স্পেন, যুক্তরাজ্য ও ইতালিতে গত অর্থবছরে এক হাজার ৪৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে বাংলাদেশ থেকে। দেশের রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র জরুরি অবস্থা জারি করেছে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া, প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানির জন্য বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ৬৮৭ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
সোহেল টেক্সটাইল মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজ্জাকুল হোসেন বলেন, ইউরোপ-আমেরিকায় ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় রপ্তানিতে চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক ক্রেতা ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত করার বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। কেউ কেউ বাতিলও করেছে। একজন রপ্তানিকারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তার ৩০ শতাংশ রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়েছে। বাংলাদেশ ইন্ডেন্টিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি এম এস সিদ্দিকী বলেন, আমদানি অনেক কমে গেছে। রপ্তানি কম হতে পারে এই আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা কাঁচামাল আমদানি করছেন না।

জানা গেছে, প্রাইমার্ক তাদের সব অর্ডার স্থগিত করেছে। যেসব পণ্য দু-একদিনের মধ্যে পাঠানোর কথা ছিল, সেগুলো তারা জাহাজে তোলার পরিবর্তে কারখানাতে রাখতে বলেছে। আর আগামী মাসগুলোতে যেসব পণ্য তৈরির কথা ছিল, সেগুলো আপাতত তৈরি না করার পরামর্শ দিয়েছে। এ ছাড়া জারা, ব্ল্যাকবেরি, পুল অ্যান্ড বেয়ার, সিঅ্যান্ডএ, বেবিশপও অর্ডার বাতিল ও স্থগিত করেছে বলে জানা গেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদ থেকে জানা গেছে, ইউরোপ ও আমেরিকাতে খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ ও খোলা রাখার সময় কমিয়েছে একাধিক ব্র্যান্ড। ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন ও অস্ট্রিয়াতে প্রাইমার্কের ৭৪টি বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ করা হয়েছে। জাপানের ইউনিক্লো যুক্তরাষ্ট্রে তাদের বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ রেখেছে। বিশ্বের অন্যতম বড় খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান এইচঅ্যান্ডএম ১২টি বাজারে তাদের বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করেছে। জারা স্পেনে তাদের বিক্রয়কেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে। নাইকি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, পশ্চিম ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে।

অন্যান্য রপ্তানি খাত : শাক-সবজি, ফল, হিমায়িত মাছ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বাংলাদেশে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বড় বাজারও ইউরোপ ও আমেরিকা। পাটের বাজার চীন ও ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। শাক-সবজি, হিমায়িত মাছ ইত্যাদি যায় মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে। শাক-সবজি রপ্তানিকারকদের সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনসুর , প্রতিদিন গড়ে ৬০ টন করে শাক-সবজি রপ্তানি হতো দেশ থেকে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও যুক্তরাজ্যে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা এসব শাক-সবজির প্রধান ক্রেতা। এখন একমাত্র কাতার ছাড়া অন্যান্য সব দেশে রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। কাঁকড়া ও কুচে রপ্তানি বন্ধ রয়েছে আগে থেকেই।
লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুল মোমেন ভূঁইয়া বলেন, ফুটওয়্যারের বড় বাজার ইউরোপ। সেখানকার অনেক শহরের দোকানপাট বন্ধ। খুচরা পর্যায়ে বিক্রি না থাকলে তারা স্বাভাবিকভাবেই আমদানি বন্ধ রাখবে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়নি।
আমদানি পরিস্থিতি : বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, গত জানুয়ারি মাসে ৫৩৩ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে, যা আগের বছরের জানুয়ারির তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কম। আমদানি কমে যাওয়ায় বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়ে এর দাম কমতে শুরু করেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক তিন বছর পর ১১ কোটি ডলার কিনেছে। চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা গেছে, গত ফেব্রুয়ারিতে এক লাখ ৮০ হাজার কনটেইনার পরিবহন হয়েছে, যা জানুয়ারি মাসে ছিল ২ লাখ ১২ হাজার। বন্দরের জেটিতে অপেক্ষমাণ জাহাজও কমে এসেছে।

অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শামস-উল-ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, আমদানি-রপ্তানি উভয় খাতেই এলসি খোলা কমে গেছে। আমদানি বেশি কমেছে।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: নিরাপত্তা সতর্কতা!!!