সুন্দরবন উপকূলে ‘বাঘ বিধবা’ নারীদের কষ্টের জীবন

pic.baghbidhoba.jpeg

ব্যাঘ বিধবা নারীদেরকে স্বাবলম্বী করতে সেলাই প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন আইসিটি নামের একটি বেসরকারি সংস্থা

হারুন অর রশিদ, prabartan | প্রকাশিত: ১১:৩০, ০৮- ০৩-১৯

খুলনার কয়রার গুড়িয়াবাড়ি গ্রামের কালাম শিকারি তিন বছর আগে বাঘের পেটে গেছে। কিশোর ছেলেকে নিয়ে ফজরের সময় বনের খালে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। ছেলেকে নৌকার রেখে খালে নেমেছিলেন তিনি। এরইমধ্যে আকস্মিকভাবে বাঘের আক্রমণে পড়েন কালাম। ছেলে বাড়ি ফিরে খবর জানালে এলাকা থেকে একদল লোক সেখানে যায় কালামকে উদ্ধার করতে। মুখম-ল আর একখানা পা উদ্ধার করা সম্ভব হয়। বাকিটা খেয়ে ফেলেছিল। স্বামী হারিয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে দিশেহারা মঞ্জুয়ারা খাতুন নেমে পড়েন জীবন যুদ্ধে।

সুন্দরবনে শামুক সংগ্রহ করতে গিয়ে বছর দশেক আগে বাঘের পেটে গেছেন গোলখালি গ্রামের আব্বাস মোল্লা। আব্বাস মোল্লাকে বাঘে নেওয়ার পর তার পরিবারে নেমে আসে চরম সংকট। সংসারের বোঝা ওঠে স্ত্রী মরিয়ম বেগমের কাঁধে। তাকেও জীবিকার প্রয়োজনে ছুটতে হয় সুন্দরবনে।
মরিয়ম বেগম বলেন, ‘সমাজের চক্ষে আমরা স্বামী খেকো হলিও ছাওয়াল মাইয়ে গো মুখির দিকি তাকায়ে বাইচে থাকতি হয়। আর বাইচে থাকতি হলি, মানষির আকথা-কুকথা শুনেও কামাই (রোজগার) করতি হয়।’

ব্যাঘ বিধবা নারীদেরকে স্বাবলম্বী করতে সেলাই প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন আইসিডি নামের একটি বেসরকারি সংস্থা

সুন্দরবন লাগোয়া গ্রামগুলোতে বাঘের আক্রমনে স্বামী হারানো নারীরা এখন ‘বাঘ বিধবা’ হিসেবে পরিচিত। স্বামী হারানো বাঘ বিধবা এসব নারীর জীবন চলছে ধুঁকে ধুঁকে। স্বামী হারানোর কষ্টের সঙ্গে তাদের জীবনে যোগ হয় সামাজিক নিগ্রহ। পরিচিতি পায় ‘অপয়া’ হিসাবে। স্ত্রীর মন্দভাগ্য স্বামীকে বাঘের মুখে ফেলেছে বলে মনে করে স্থানীয় সমাজ। এই দায় মাথায় নিয়ে বহু বাঘ বিধবা নারী বাধ্য হয় স্বামীর ঘর ছাড়তে। কিন্তু তারপরও বেঁচে থাকতে হয় তাদের। সন্তান লালন পালন করতে হয়, রোজগারে নামতে হয়।

সম্প্রতি ইনিসিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভলেপমেন্ট (আইসিটি) নামের একটি বেসরকারি সংগঠন বাঘ বিধবা নারীদের পরিসংখ্যন করেছে। তাদের পরিসংখ্যন অনুযায়ি ২০০০ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৮৫০ জন বাঘ বিধবা নারী রয়েছেন কয়রা উপজেলায়। এছাড়া কয়রা উপজেলার পাশ্ববর্তি শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, মুন্সিগঞ্জ ও বুড়িগোয়ালিনি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে অসংখ্য বাঘ বিধবা নারী রয়েছে। যাদের প্রত্যেকের জীবন এক একটি কষ্ট গাঁথা। গাবুরা গ্রামের ‘বাঘ বিধবা’ সোনামনির কষ্টের কাহিনী সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় রূপকথার মত সকলেই জানে। তার প্রথম স্বামী বাঘের পেটে যাওয়ার পর মাত্র একমাস বয়সী শিশুসহ স্বামীর বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয় শাশুড়ি। শিশুটিকে নিয়ে পথে নামতে হয় তাকে। পরে সোনামনির বিয়ে হয় তার দেবরের সাথে। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে তাকেও বাঘে ধরে নিয়ে যায়। দুই স্বামী বাঘের পেটে যাওয়ার পর সোনামনি ‘স্বামীখেকো’ বলে পরিচিতি পায় এলাকায়। গ্রাম্য সমাজ তাকে ভিন্ন চোখে দেখতে শুরু করে। সমাজে চলাফেরাই তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। শাশুড়ি তাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, যাতে সকালে ঘুম থেকে উঠে সোনামনির মুখ দেখতে না হয়। একজন সোনামনির গল্প থেকেই হাজারো বাঘ বিধবা নারীর জীবন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

সুন্দরববন সংলগ্ন কয়রা ও শ্যামনগরের গ্রামে ঘুরলে এ রকম বহু ‘বাঘ বিধবা’ নারীর সঙ্গে দেখা মিলে। কেউ কাঠ কাটতে গিয়ে, কেউ মাছ ধরতে গিয়ে, কেউ মধু আহরণ করতে গিয়ে বাঘের পেটে গেছে। তাদের গল্পগুলো প্রায় একই রকম। বাঘের আক্রমণের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারে চরম বিপর্যয় নেমে আসার কথা উল্লেখ করে কয়রার দক্ষিন বেদকাশি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গাজী শামসুর রহমান বলেন, পরিবারের কর্মক্ষম মানুষটি বাঘের আক্রমনে মারা যাওয়ায় পরিবারে আর্থিক সংকট সৃষ্টি হয়। তবে এলাকায় শিক্ষার হার অনেক কম ছিল বলে স্বামীকে বাঘে ধরলে শ্বশুর বাড়ির লোকজন দোষ দিত স্ত্রীকে। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার পক্ষ থেকে এসব বিধবা নারীদের কর্মসংস্থানেরও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ‘বাঘ বিধবা’ নারীদের সামাজিক মর্যাদা ও পুনর্বাসন নিয়ে কাজ করছে বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে এসব বিধবা নারীদের সংগঠিত করা হচ্ছে। গঠিত হয়েছে ‘বাঘ বিধবা এসোসিয়েশন’। এসোসিয়েশনের সাপ্তাহিক বৈঠকে নিজেদের অবস্থার উন্নয়ন, জমি চাষ, সেলাইয়ের কাজ শেখা থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হয়। বিধবা নারীরা একত্রিত হয়ে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের পরিকল্পনা করেন। তবে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের বিভিন্ন কার্যক্রম গৃহিত হলেও তার অর্জন সামান্যই।

উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের কপোতাক্ষ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক রমেন রায় বলেন, এক সময় এ এলাকায় মাঠে ফলতো ধান। চাষাবাদের মাধ্যমেই বহু মানুষের জীবিকা নির্বাহ হতো। সময়ের বদলে ধানের স্থান দখল করে নিয়েছে চিংড়ি। চিংড়ি চাষের কারণে মাঠে লবণ পানি ঢোকানোর ফলে বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে। এদের একটি বড় অংশ সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল হয়েছে। সুন্দরবনে যাওয়ার কারণেই তাদের বিপদ বাড়ছে। নারীরা বিধবা হয়ে সমাজের কাছে নিগৃহীত হচ্ছে। তবে অবস্থা আগের চেয়ে বদলাচ্ছে।

সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় নারীদের জীবনমান উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা নবযাত্রা প্রকল্পের উপজেলা সমন্বয়কারি আলবার্ট প্রসাদ বসু বলেন, সুন্দরবন লাগোয়া এলাকাগুলোতে বাঘ বিধবা নারীরা সামাজিক নিগ্রহের শিকার। এসব নারীদের কর্মসংস্থানের লক্ষে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। যাতে তারা স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারে।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top