রোগশোক-দুর্ঘটনায় মৃত্যু বাড়ছে পুলিশে

Screenshot_2021-03-05-রোগশোক-দুর্ঘটনায়-মৃত্যু-বাড়ছে-পুলিশে.png

নিজস্ব প্রতিবেদক: জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাসহ জাতীয় যে কোনো সংকটে সামনে থেকে দায়িত্ব পালন করছে পুলিশ। মহামারি করোনাকালে নিজেদের নিয়মিত দায়িত্বের পাশাপাশি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অসুস্থ করোনা রোগীদের হাসপাতালে নেয়ার কাজও করেছেন এই বাহিনীর সদস্যরা। এমনকি করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তির স্বজনরা দূরে সরে গেলে দাফনের কাজও পুলিশ সদস্যরাই করেছেন। জনসেবায় অগ্রভাগের এই বাহিনীতে সাম্প্রতিক সময়ে মৃত্যু বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে।

দেশের সড়কে পরিবেশ দূষণ বিশেষ করে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের স্বাস্থ্যঝুঁকির বড় কারণ বলে ধরা হয়। সব সময় ধুলোবালিতে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালনের কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন পুলিশ সদস্যরা। এছাড়া পেটে সমস্যা, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা, দীর্ঘ সময় মূত্র আটকে রাখার কারণে কিডনিতে সমস্যা সৃষ্টি ও শ্বাসকষ্ট হচ্ছে

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনাকালে অসীম সাহসে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণোৎসর্গ করতে হয়েছে অনেক পুলিশ সদস্যকে। এছাড়া দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দুর্ঘটনা, খাবার ও বিশ্রামের ব্যাঘাতের কারণে নানা রোগে অকাল মৃত্যু বাড়ছে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে। বাহিনীটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও পুলিশ হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, কর্মঘণ্টা কমানো, কাজের পরিবেশ উন্নয়ন, উন্নত লজিস্টিক সাপোর্ট, চিকিৎসার পরিধি বাড়ানো হলে রোগের ঝুঁকি যেমন হ্রাস পাবে, তেমনি বাড়বে পুলিশের সেবার মান।

জানা গেছে, নানা কারণে গত এক বছরে পুলিশের ২০৮ জন সদস্য মারা গেছেন। এর মধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৮৬ জন। বাকিদের মধ্যে অনেকের নানা রোগে ও অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। মারা যাওয়া পুলিশ সদস্যদের প্রতিটি পরিবারই স্বজন হারানোর শোক আর অর্থকষ্টে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।

প্রতিবছরই উদ্বেগজনক হারে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পুলিশের মৃত্যুর সংখ্যা। সর্বশেষ চার বছরে এ মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। পুলিশ সদরদফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে ১৩০, ২০১৮ সালেও ১৩০, ২০১৯ সালে ১৭৯ পুলিশ সদস্য কর্মক্ষেত্রে মারা যান। গত বছর (২০২০) মারা যান ২০৮ জন; যাদের অধিকাংশই কনস্টেবল। মৃত্যুর এ তালিকায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সদস্যই বেশি।

পুলিশে মৃত্যু বৃদ্ধির প্রসঙ্গটি উঠে এসেছে সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর পুলিশ স্টাফ কলেজে আয়োজিত ‘পুলিশ মেমোরিয়াল ডে-২০২১’ অনুষ্ঠানে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও। সেখানে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তাফা কামাল উদ্দীন, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ প্রমুখ।

করোনাকালে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মারা যাওয়া পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এআইজি সাঈদ তারিকুল হাসানের পক্ষে তার স্ত্রী আজুবা সুলতানা, বগুড়ার ৪-এপিবিএন পুলিশ সুপার নিজাম উদ্দিনের পক্ষে তার স্ত্রী মহিমা নিজাম, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার মিজানুর রহমানের পক্ষে তার স্ত্রী হাছিনা ফেরদৌসী, ডিএমপির নিরস্ত্র পুলিশ পরিদর্শক রাজু আহম্মেদের পক্ষে তার স্ত্রী আফরোজা নাজনিন পলি, স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) এসআই নাজির উদ্দিনের পক্ষে তার স্ত্রী নার্গিস আহমেদ, ডিএমপির কনস্টেবল মো. ইসমাইল হোসেনের পক্ষে তার স্ত্রী শাহনাজ ও ডিএমপির কনস্টেবল ইসমাইলের পক্ষে তার ছেলে চাঁন মিয়ার হাতে সম্মাননা স্বীকৃতি স্মারক তুলে দেয়া হয় ওই অনুষ্ঠানে।

অনুষ্ঠানে আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, দেশের মানুষের জন্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা কাম্য নয়। পুলিশ ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। করোনাকালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছেন তারা। করোনাকালে সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে মানুষের সেবায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমাদের বিভিন্ন পদমর্যাদার ৮৬ জন পুলিশ সদস্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। করোনায় আক্রান্ত হওয়া পুলিশ সদস্যরা সুস্থ হয়ে পুনরায় তাদের দায়িত্বে নিয়োজিত হয়েছেন।

তিনি বলেন, করোনার সময় কৃষকরা যখন শ্রমিকের অভাবে ধান কাটতে পারেনি, তখন আমরা শ্রমিক পাঠানোর ব্যবস্থা করেছি। অনেক জেলায় আমাদের পুলিশ সদস্যরা নিজেরাই কৃষকের জমির ধান কেটে বাড়িতে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। জঙ্গি, সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত দেশ প্রতিষ্ঠা করতে পুলিশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যে কোনো সংকটময় মুহূর্তে পুলিশ সম্মুখসারিতে কাজ করে। জনগণের জন্য কাজ করে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ।

সিনিয়র সচিব মোস্তাফা কামাল উদ্দীন বলেন, নির্যাতিত মানুষের প্রথম আশ্রয়স্থল হলো পুলিশ। আমরা ঔপনিবেশিক পুলিশ নয়, আমরা দেশের মানুষের সেবার পুলিশ হবো। তাই পুলিশ হবে জনতার, পুলিশ হবে মানবিক। পুলিশ অনেক ধৈর্যের সঙ্গে দেশের যে কোনো সংকট মোকাবিলা করে যাচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, জাতীয় যে কোনো সংকটে জনগণের পাশে থাকে পুলিশ। মহামারি করোনার সময় পরিবারের সদস্যরা দূরে চলে গেলেও মারা যাওয়া ব্যক্তির দাফনের কাজও পুলিশ সদস্যরাই করেছেন। করোনাকালে নিজেদের দায়িত্বের পাশাপাশি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অসুস্থ করোনা রোগীদের হাসপাতালে প্রেরণ করেছেন পুলিশ সদস্যরা। এই কাজ করতে গিয়ে অনেকে আত্মদান করেছেন।

করোনায় পুলিশে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণ সম্পর্কে রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) সাইফুল ইসলাম শানতু বলেন, করোনাকালে যে কোনো পেশার চেয়ে পুলিশ সবসময় মাঠে থেকে কাজ করেছে। ছেলে যখন মাকে ছেড়ে গিয়েছে তখন পাশে পুলিশই ছিল। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত, দৈনন্দিন ডিউটি পালন, এলাকা কিংবা বাড়ি লকডাউন, করোনা রোগীদের সেবা, করোনা রোগীদের বাসায় গিয়ে খাবার পৌঁছে দেয়া, লাশ দাফন ইত্যাদি কারণে পুলিশ বারবার আক্রান্ত হয়েছে। এসব কাজ করতে গিয়ে পুলিশ নিজের নিরাপত্তার চেয়ে মানুষের নিরাপত্তার কথা বেশি ভেবেছে।

জানতে চাইলে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের কার্যনির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জায়েদুল আলম বলেন, মৃত্যুবরণকারী পুলিশ সদস্যের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা ও পরিবারের চাকরি প্রার্থীদের চাকরির ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হয়।

সরকার পুলিশের উন্নয়নের পাশাপাশি আধুনিকায়ন করছে। তার জন্য আরও জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়াতে হবে। তাহলে কর্মঘণ্টা হ্রাসের পাশাপাশি মৃত্যুঝুঁকিও কমবে বলে মনে করেন পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের কার্যনির্বাহী কমিটির এই সাধারণ সম্পাদক।

পুলিশের মৃত্যুর হার বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মনোয়ার হোসেন খান বলেন, তিনটি জটিল রোগে বেশি পুলিশ সদস্য মৃত্যুবরণ করছেন। এর মধ্যে- হৃদরোগ, ক্যানসার ও কিডনিজনিত রোগ। কর্মস্থলেই অনেক পুলিশ সদস্য হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। হৃদরোগ অনেকের পারিবারিকভাবে থাকে। এছাড়া হঠাৎ দুর্ঘটনাজনিত কারণেও অনেক পুলিশ সদস্যের মৃত্যু হচ্ছে। খাওয়া-দাওয়ায় অনিয়ম, রাস্তায়

তিনি বলেন, দেশের সড়কে পরিবেশ দূষণ বিশেষ করে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের স্বাস্থ্যঝুঁকির বড় কারণ বলে ধরা হয়। সব সময় ধুলাবালিতে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালনের কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন পুলিশ সদস্যরা। এছাড়া পেটে সমস্যা, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা, দীর্ঘ সময় মূত্র আটকে রাখার কারণে কিডনিতে সমস্যা সৃষ্টি ও শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। তারা ঠিকমতো পানি পান করতে পারেন না ও মাঝে মাঝে তাদের অনেকটা বাধ্য হয়েই সড়কে খাবার খেতে হয়।

পূর্বের চেয়ে রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের সক্ষমতা বেড়েছে জানিয়ে ডা. মনোয়ার হোসেন খান বলেন, আমাদের হাসপাতাল পুলিশের বিশাল পরিবারকে স্বাস্থ্যসেবা দিতে সক্ষমতা অর্জন করেছে। বর্তমান আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও দিক নির্দেশনায় পূর্বের সমস্যাগুলো অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছি এবং অচিরেই ক্যানসার ইনস্টিটিউট স্থাপনের যে পরিকল্পনা তিনি করেছেন তা সফলতার মুখ দেখবে। বিশাল বাহিনীর পুলিশ সদস্যরা অন্য কোনো হাসপাতালে না গিয়ে রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে প্রায় সব সুযোগ-সুবিধা পান।

পুলিশে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে কেন জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) মো. সোহেল রানা বলেন, দেশকে সন্ত্রাস, মাদক ও জঙ্গিমুক্ত রাখতে গিয়ে এবং পেশাজনিত নানা রোগে প্রতি বছর পুলিশ সদস্যদের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার সময় কিংবা সড়কে ডিউটি করার সময় দুর্ঘটনায় অনেক সদস্যের মৃত্যু হয়। রাতের অন্ধকারে পুলিশ সদস্যরা অপরাধীদের পেছনে পাহাড়ে-জঙ্গলে-নদীতে ছুটতে গিয়ে আহত হন বা মারা যান। রাস্তায় রাস্তায় ডিউটি করার কারণে পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাহিনীর সদস্যদের খাবার এবং বিশ্রামের ব্যাঘাত ঘটে।

তিনি বলেন, দেশে করোনা বিস্তারের শুরু থেকে জনগণের সেবা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। মানুষের জন্য সর্বোচ্চ ঝুঁকি নেয়ায় একক পেশা হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশের গর্বিত সদস্যরা সর্বোচ্চসংখ্যক করোনার সংক্রমণের শিকার হয়েছেন ও মৃত্যুবরণ করেছেন। আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর ড. বেনজীর আহমেদ বিরামহীনভাবে করোনা প্রতিরোধে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও সময়োপযোগী দিকনির্দেশনায় আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের সুস্থ করতে আন্তরিকভাবে কাজ করছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। সহকর্মী হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করে দেশসেবার দৃপ্ত শপথ বুকে ধারণ করে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: নিরাপত্তা সতর্কতা!!!