করোনাভাইরাস : তীব্র মন্দার হুমকিতে বিশ্ব অর্থনীতি

Untitled-2-samakal-5e518411c5398.jpg

আকস্মিকভাবে বিক্রি কমার পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তিপণ্য নির্মাতা অ্যাপল। আমেরিকার জেনারেল মোটরস নিজ দেশে যত গাড়ি বিক্রি করে, তার চেয়ে বেশি হয় চীনে। তার উৎপাদনও কমেছে। জাপানের টয়োটারও একই অবস্থা। বিশ্বের বৃহত্তম অনলাইন রিটেইল শপ আমাজনের মজুদে টান পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বহু দেশে।

এসবের একটিই কারণ- চীনে মরণব্যাধি করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব। চীনে প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের গতিতে আঘাত হেনে ভাইরাসটি ক্রমশ ছড়িয়ে পড়েছে অন্যান্য দেশে। শত শত মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি এখন যে প্রশ্ন সবার মনে উঁকি দিচ্ছে, তা হচ্ছে- এর অর্থনৈতিক প্রভাব কী হবে?

চীনকে বলা হয় ‘বিশ্বের কারখানা’। সারা বিশ্বে যত পণ্য উৎপাদিত হয় তার এক-চতুর্থাংশ আসে চীন থেকে। ফলে চীনে উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব হবে ভয়াবহ।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিভা তাই যথার্থই বলেছেন, বিশ্ব এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় যে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে তার নাম করোনাভাইরাস বা কভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব। অনেক অর্থনীতিবিদ ও বিশ্নেষক আশঙ্কা করছেন, করোনার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিতে পারে।

করোনাভাইরাস এমন সময় আঘাত হানল যখন বিশ্ব একটি মন্দা কাটিয়ে উঠছিল। জর্জিভা বলেছেন, করোনা দীর্ঘস্থায়ী হলে চীন ও বিশ্ব অর্থনীতির ওপর তার তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব পড়বে। কারণ, এতে পণ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমবে। ফলে এর বৈশ্বিক প্রভাব হবে বহুমুখী।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতির যোগসূত্র এখন বেশ জোরালো। ২০০৩ সালে চীনে যখন সার্সের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়, তখনই বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্তত চার হাজার ৫০০ কোটি ডলার ক্ষতি হয় বলে অর্থনীতিবিদরা জানিয়েছিলেন। তখন এ রোগে চীনসহ ১৭টি দেশে মারা যায় প্রায় ৮০০ লোক।

জর্জিভা জানিয়েছেন, চলতি শতাব্দীর শুরুতে চীন বিশ্ব অর্থনীতির আট ভাগের মালিক ছিল। এখন বেইজিং নিয়ন্ত্রণ করছে বিশ্ব অর্থনীতির ১৯ ভাগ বা প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।

করোনাভাইরাস দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং অন্য দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ব অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে, তার উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড ইকোনমিকস।

বৃহস্পতিবার তাদের পূর্বাভাসে বলা হয়, করোনাভাইরাস এশিয়ার বাইরে ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতি হবে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি (১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন) ডলারের, যা বিশ্বের মোট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ১ দশমিক ৩ শতাংশ। বিশ্বের ১৬তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ইন্দোনেশিয়ার জিডিপির সমান ক্ষতি হবে এতে।

অক্সফোর্ড ইকোনমিক্স বলছে, ইতোমধ্যে করোনার ‘শীতল প্রভাব’ পড়তে শুরু করেছে। কারণ চীনের কারখানা বন্ধের প্রভাব প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর পড়তে শুরু করেছে। এর ফলে বিশ্বের বড় কোম্পানিগুলো বিভিন্ন পণ্যের উপকরণ এবং তৈরি পণ্য এসব দেশ থেকে সংগ্রহ করতে হিমশিম খাচ্ছে।

যেমন অ্যাপলের আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ, আইফোনের উৎপাদন ও বিক্রি কমে যেতে পারে। চীন আইফোনের এক বড় ক্রেতা। গাড়ি নির্মাতা জাগুয়ার ল্যান্ডরোভার সরবরাহ সমস্যায় ভুগছে বলে জানিয়েছে। করোনার কারণে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার গত বছরের ৬ শতাংশ থেকে কমে এবার ৫ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে।

করোনাভাইরাস আরও ছড়িয়ে পড়লে চলতি বছর বিশ্বের জিডিপি ৪০ হাজার কোটি ডলার কমে যেতে পারে। অক্সফোর্ড ইকোনমিকস বলছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমার কারণ হচ্ছে চীনা ক্রেতাদের বিলাসী পণ্য কেনার হার কমবে এবং ভ্রমণ ও পর্যটনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ ছাড়া প্রভাব পড়বে বিনিয়োগ ও শেয়ার বাজারেও। ইতোমধ্যে চীনসহ কয়েকটি দেশের শেয়ারবাজারে ধাক্কা লেগেছে করোনার।

চীনের ওপরও করোনার প্রভাব হবে ভয়াবহ। প্রাদুর্ভাব দীর্ঘস্থায়ী হলেও চীনের বড় কোম্পানিগুলো টিকে থাকতে সক্ষম হবে। তবে বহু কর্মী চাকরিচ্যুত হবেন। কমবে বেতন। জরিপে দেখা গেছে, দেশটির শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৮৫ ভাগ বড় কোম্পানি ছয় মাস পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবে টিকে থাকতে পারবে।

চীনের এক হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ওপর দেশটির দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, এক মাসে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এক-তৃতীয়াংশ কারখানা তহবিলশূন্য হয়ে পড়বে। এ ছাড়া ৭০০ কোম্পানির ওপর পরিচালিত আরেক জরিপে দেখা যায়, সেগুলোর ৪০ ভাগই তিন মাসের মধ্যে তহবিলশূন্য হয়ে যাবে। বাস্তবতা হচ্ছে পরিস্থিতির দিন দিনই অবনতি হচ্ছে।

করোনাভাইরাসের কারণে জাপানের অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে দক্ষিণ কোরিয়া ও জার্মানির অর্থনীতিতেও। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের অর্থনীতিতে প্রভাব অনিবার্য বলে দেশগুলো জানিয়েছে।

চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অন্তর্ভুক্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোও করোনার ধাক্কা এড়াতে পারবে না। প্রভাব পড়বে এসব দেশের কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে। চীনের বড় বাণিজ্যিক অংশীদার ব্রাজিলে মন্দা দেখা দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রও করোনার প্রভাবমুক্ত থাকবে না বলেই মনে করা হচ্ছে।

চীন এখন আমেরিকায় অটো কারখানার যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে। বাংলাদেশ, তুরস্ক, মেক্সিকোসহ বহু দেশের পোশাক কারখানাগুলোও ভীষণভাবে চীনের কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল।

চীন শুধু সারা বিশ্বে পণ্য সরবরাহই করে না। চীনের ১৪০ কোটি মানুষ এখন ইলেকট্রনিক গ্যাজেট, ফ্যাশনেবল পোশাক আর বিদেশ ভ্রমণেও প্রচুর অর্থ ব্যয় করে থাকে। দেশটির মানুষের আয় দেড় যুগেরও কম সময়ে বেড়েছে কয়েক গুণ। ২০০৩ সালে চীনাদের বার্ষিক গড় আয় ছিল ১৫০০ ডলার। গত বছর তা পৌঁছায় ৯০০০ ডলারে। ইন্টেল ২০১৯ সালে চীনে পণ্য বিক্রি করে আয় করেছে ২০০০ কোটি ডলার, যা ওই বছরে কোম্পানির মোট আয়ের ২৮ শতাংশ। মোবাইল ফোনের শীর্ষ চিপ নির্মাতা কোয়ালকমের আয়ের ৪৭ শতাংশ আসে চীন থেকে। ২০১৯ সালে চীনে চিপ বিক্রি করে কোম্পানিটি আয় করেছে ১২০০ কোটি ডলার। অক্সফোর্ড ইকোনমিক্স বলছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে চীন এখন বড় খেলোয়াড়।

বিশ্বব্যাংক বলছে, সার্সের পর চীনের অর্থনীতির আকার আট গুণ বড় হয়েছে। জিডিপির আকার এক লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ কোটি ডলারে।

বিনিয়োগ তহবিল ব্যবস্থাপক ম্যাথিউ এশিয়ার অর্থনীতিবিদ অ্যান্ডি রটম্যান বলেছেন, বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এক-তৃতীয়াংশ আসে চীন থেকে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানের মোট প্রবৃদ্ধির চেয়েও চীন এগিয়ে। আমেরিকার বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক মর্গ্যান স্টানলির এশিয়া বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান স্টিফেন রোচ সোমবার বলেছেন, করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিতে পারে।

বিমান সংস্থাগুলোর সামনে ‘কঠিন বছর’ :আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সমিতি (আইএটিএ) বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে করোনাভাইরাসের কারণে এবার ২৯৩০ কোটি ডলার ক্ষতি হবে। এবার বিমান সংস্থাগুলোর যাত্রী ১৩ শতাংশ কমে যাবে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। আইএটিএর সিইও অ্যালেক্সান্দ্রে ডি জুনিয়াক এক বিবৃতিতে বলেছেন, বিমান সংস্থাগুলোর জন্য এ বছরটি কঠিন যাবে। সংস্থাটি বলছে, চীনের অভ্যন্তরীণ যাত্রী চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আয় কমবে ১২৮০ কোটি ডলার। তবে করোনাভাইরাস চীনের বাইরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়বে।

করোনার কারণে প্রতিদিন ১৩ হাজার ফ্লাইট বাতিল করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত দুই লাখের বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এর বেশিরভাগই চীনের অভ্যন্তরীণ।

আশার কথা হচ্ছে, সার্সের পর চীনের অর্থনীতি সংকুচিত হয়ে পড়লেও কয়েক মাসেই দেশটি নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। এবারও তেমনটাই ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এ কথা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, চীনে যা-ই ঘটুক, তার প্রভাব হবে ব্যাপক বিস্তৃত। সূত্র :এএফপি, বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান, নিউইয়র্ক টাইমস ও ফরেন পলিসি।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top