পদত্যাগ-বহিষ্কার জামায়াতের কৌশল, আসছে নতুন নামে

dsuhyfgdsyhfgvbdshy.jpg

পদত্যাগ-বহিষ্কার জামায়াতের কৌশল, আসছে নতুন নামে

ডেস্ক রিপোর্ট, prabartan | প্রকাশিত : ২০:৫০, ১৭-০২-১৯

 

অস্থির জামায়াতের রাজনীতি। দলে সংস্কার ও মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকার জন্য জাতির সামনে ক্ষমা চাওয়ার দাবি ওঠার পর মতবিরোধ দেখা দিয়েছে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বে। দলের জয়েন্ট সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের পদত্যাগ এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য ও সাবেক শিবির নেতা মুজিবুর রহমান মঞ্জুর বহিষ্কার আদেশের পর এই বিরোধ আরো তীব্র হয়েছে।

লন্ডনে অবস্থানকারী ব্যারিস্টার রাজ্জাকের পদত্যাগের পর দলের ভেতর চাপে পড়েছে সংস্কারপন্থীরা। তারই অংশ হিসেবে বহিষ্কার হন কেন্দ্রীয় নেতা ও ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মুজিবুর রহমান মঞ্জু। এদিকে রোববার জামায়াতকে স্বাধীনতাবিরোধী দল উল্লেখ করে দিনাজপুরের এক নেতার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে সংস্কারপন্থীদের বিরোধ প্রকাশ্যে রূপ নেয়। তবে দলীয় একটি সূত্র জানায়, এর সবকিছুই দলের নীতি নির্ধারকদের পরির্বতনের পক্ষে চাপ সৃষ্টি প্রক্রিয়ার অংশ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে ব্যবসা করছেন এমন এক জামায়াত নেতা ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, বিশ্ব রাজনীতির আলোকে সময়ের সঙ্গে দলীয় কাঠামোতে পরিবর্তন চান জামায়াতের অধিকাংশ নেতাকর্মী। যারা পরিবর্তন চান না, তাদের সংখ্যা একেবারেই কম। দলের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা, কর্মপরিষদ এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বেশিরভাগ সদস্যই পরিবর্তনের পক্ষে। তবে দলে যেহেতু একক সিদ্ধান্তের সুযোগ নেই, তাই মাত্র একটি ভোটের ব্যবধানেও অনেক সময় বেশিরভাগের মতটি অগ্রহণযোগ্য থেকে যায়।

তিনি আরো বলেন, রাজ্জাক সাহেবের পদত্যাগ, মঞ্জুর বহিষ্কারসহ অন্যান্য সবকিছুই হচ্ছে দাবিগুলোর পক্ষে জোরাল অবস্থান তৈরির একটি প্রক্রিয়া। এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দলের ওপর চাপ বৃদ্ধি করতেই ছক অনুযায়ী কাজ করছে জামায়াতের একটি অংশ। তিনি আশাবাদি, শিগগিরই পরির্বতনের হাওয়া লাগবে জামায়াতে। তবে যারা দলের বাইরে যাচ্ছেন তারা ফিরে আসবেন কি না এ বিষয় স্পষ্ট করে বলতে পারেননি তিনি।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে এবং দলের ভেতরে সংস্কার চেয়ে যথার্থ কাজ করেছেন বলে জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সদ্য বহিষ্কৃত মজলিসে শুরার সদস্য এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মুজিবুর রহমান মঞ্জু। ডেইলি বাংলাদেশকে তিনি বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অবশ্যই জামায়াতের অবস্থান স্পষ্ট করা দরকার। যদি জামায়াত মনে করে, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে তারা যথাযথ কাজ করেছে, তাহলে তা সরাসরি বলা উচিত। আর তারা যদি মনে করে- তাদের ভূমিকা ঠিক ছিল না, তাহলে ক্ষমা চাওয়া উচিত।

মঞ্জু আরো বলেন, জামায়াত বিলুপ্ত হয়ে গেলে ভালো হবে। তবে সংগঠন বিলুপ্তির আগে নতুনভাবে রাজনীতি করা নিয়ে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তরুণ প্রজন্মের অনেকে দলের সংস্কারের পক্ষে। এরইমধ্যে জামায়াত বিলুপ্তির পক্ষে অধিকাংশ শুরা সদস্য ইতিবাচক মত দিলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি শীর্ষ নেতারা।

এদিকে রোববার সংস্কার বিতর্কে পদ ছাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন দলটির আমির মকবুল আহমদ। দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে ক্ষমা চাওয়া, না চাওয়ার ইস্যুতে দ্বিধাবিভক্ত কেন্দ্রীয় নেতারা। বিতর্কিতদের পাশ থেকে একে একে সড়ে দাঁড়াচ্ছেন দায়িত্বশীলরা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, খোদ আমিরই স্বপদে থাকতে চাইছেন না। সংস্কার ইস্যুতে দলে বিভক্তি প্রকাশ্য রূপ নেয়ায় বিব্রত মকবুল আহমদ। তার এক ঘনিষ্ঠজন (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, বিব্রত হওয়ার বিষয়টি আমির আমাদের কয়েকজনকে জানিয়ে বলেছেন, তার বয়স হয়েছে। এ বয়সে এসে দলের মধ্যে এমন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে, তা তিনি আশা করেননি। তাই আমির পদে তিনি আর থাকতে চাইছেন না। তিনি জামায়াতের সদস্য পদেও থাকতে স্বস্তিবোধ করছেন না।

এদিকে ৮০র দশকের ছাত্র শিবিরের নেতৃত্ব রাজনীতির মাঠে আসছে নতুন রাজনৈতিক দল ‘ইসলামিক প্রোগ্রেসিভ পার্টি’ (আইপিপি)। একাত্তরে বিতর্কিত নয় এমন জামায়াত নেতারা সমবেত হবেন এই দলে। তবে ইসলামী দল হিসেবে জামায়াত আগের জায়গায় থেকে যাবে। আর নতুন দলটি হবে নির্বাচনমুখি গণতান্ত্রিক প্লাটফর্ম। দলটির নেতৃত্ব ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে এরইমধ্যে কানাঘুষা শুরু হয়েছে বিভিন্ন মহলে।

জামায়াতের আরেকটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, আগামী মার্চে ‘ইসলামিক প্রোগ্রেসিভ পার্টি’ (আইপিপি) আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করতে পারে। আর উপজেলা নির্বাচনের কারণে মার্চে যদি সম্ভব না হয়, তাহলে জুনকে টার্গেট করে এগোবে তারা। প্রায় পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলেছে আইপিপি’র প্রস্তুতি পর্ব। গঠনতন্ত্র, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নির্ধারণসহ এরইমধ্যে নানা ধরনের কর্মকৌশল ও পন্থা তৈরি করেছে দলটির নীতি নির্ধারকরা। আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশের পরপরই নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করবে তারা। সফল না হলে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হবে আইপিপি। তুরস্কের একে পার্টির আদলে আইপিপি’র কার্যক্রম ও কর্মপন্থা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলটির একজন সমন্বয়ক।

নতুন দল গঠনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি কাজ শুরু করেছে। দলের নির্বাহী পরিষদের ১৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত অধিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্যদের বিবেচনার জন্য পাঠানো হয়। জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্যদের পাঠানো নির্দেশনার চিঠি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এদিকে, নিরবে নিভৃতে পাঁচ বছর পরিকল্পনা করে একটি দলের আত্মপ্রকাশের পেছনে কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে নানা মহলে। এ বিষয় জামায়াতের নিষ্ক্রিয় চট্টগ্রামের ওই ব্যবসায়ী জানান, নতুন পার্টি নিয়ে এখনো আলোচনা হয়নি। প্রস্তাবনাও আসেনি। তবে ভাবনার পর্যায় রয়েছে। কিন্তু সেটা কোনোভাবেই ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক প্লাটফর্ম হবে না। সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ও নির্বাচনমুখি একটি সুস্থ রাজনৈতিক ধারাকে বেছে নেয়া হচ্ছে। আর আদর্শিক জায়গা থেকে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাবে জামায়াত।

অন্যদিকে জামায়াতের আরেকটি সূত্র জানায়, দলটি বিএনপি’র নেতৃত্বে জোটে আছে ২০ বছরেরও বেশি সময়। তবে এখন জোট থেকেও চূড়ান্তভাবে বেড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জামায়াত। সমন্বয়ের অভাবে যে কোনো ধরনের কর্মসূচি পালনে ব্যর্থ হয়েছে বলেও মনে করেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। আর সে কারণে জামায়াত নতুন কর্মকৌশলে এগোচ্ছে বলে জানায় ওই সূত্রটি।

নির্বাচনের পর দু একটি অভ্যন্তরীণ বৈঠক ছাড়া জামায়াত কোনো কর্মসূচি হাতে নেয়নি। তবে এরইমধ্যে দলটির ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির ২০১৯ সালের জন্য নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা করেছে।

জামায়াতের আরেকটি সূত্র জানায়, জামায়াতে ইসলামী দলের নামে ভবিষ্যতে আর কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না। এছাড়া এ মুহূর্তে কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে দলটির অধিকাংশ নেতা-কর্মী অনিচ্ছুক।

সূত্রটি আরো জানায়, অল্প দিনের মধ্যেই জামায়াত বিএনপি জোট থেকে বেড়িয়ে যাবে। বিএনপির কাছে জামায়াত দাবি জানাবে ২০ দলীয় জোট ভেঙে দিতে। আর তা যদি না হয় তাহলে জামায়াত যে জোটে থাকছে না- সে ঘোষণা বিএনপির পক্ষ থেকে দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তবে এ বিষয় জামায়াত অনুসারী ওই ব্যবসায়ী জানান, জামায়াত ঘোষণা দিয়ে জোট থেকে বের হবে না। বিএনপিও জামায়াতকে জোট ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানাবে না। ধীরে ধীরে জোটে নিষ্ক্রিয় হবে তারা। তারপর যুগপথ রাজনীতি অব্যাহত রাখবে বিএনপি-জামায়াত।

সূত্রটি আরো জানায়, জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি এখন সমাজ বিনির্মাণে মনোযোগ দেবে। তারা এরইমধ্যে ৩০ বছর মেয়াদী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। আপাতত রাজনীতির মাঠ থেকে নিজেদেরকে পুরোপুরি গুটিয়ে নেবে জামায়াত। আগামী ৩০ বছর শুধু সামাজিক কাজ ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে তৎপরতা চালাবে তারা।

সূত্র মতে, জামায়াত প্রশাসন থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল সৃষ্টি করবে। তাদের তরুণ প্রজন্ম অনেক দিন ধরে দলটির স্বাভাবিক কোনো কার্যক্রমে অংশ নিতে পারছে না। এছাড়া জামায়াত পরিচয়ে রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়তেও প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। এ কারণে কৌশলগতভাবে তারা এখন বিভিন্ন সেক্টরে দক্ষ জনবল তৈরিতে মনোযোগী হচ্ছে।

জামায়াত সমর্থক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের মতে, একাত্তরে বিতর্কিত ভুমিকা, জঙ্গিবাদ, জ্বালা-পোড়াওয়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে অর্থ ও জনবল সংকটে পড়েছে তারা। আর এ কারণেই ভিন্নপথে হাঁটছে জামায়াতে ইসলামী।

 

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top