আঁধার সরিয়ে প্রভাতের আলো ছড়াবে যে স্কুল

vcdxhbvhbvhbvjkfd.jpg

আঁধার সরিয়ে প্রভাতের আলো ছড়াবে যে স্কুল

হারুন অর রশিদ, Prabartan | আপডেট: ১৮:০৪, ১৬-০২-১৯

 

দিন কাটে যাদের আদিম সভ্যতার ঘুটঘুটে অন্ধকারে। সে আঁধার সরিয়ে আজও আধুনিকতার আলোয় আলোকিত হতে পারেনি তারা। সেখানে সভ্যতার আলো ছড়াতে আলোক বর্তিকা হয়ে এগিয়ে এসেছে এক তরুণ। নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন একটি ছোট্ট স্কুল। নাম বিরসা মুন্ডা প্রভাতি স্কুল। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে মুন্ডা সম্প্রদায়ের স্বপ্ন পুরুষ বিরসা মুন্ডার নামে স্কুলটির নামকরণ করা হয়েছে।

খুলনার কয়রা উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার পূর্বে সুন্দরবন সংলগ্ন ৬ নম্বর কয়রা গ্রামের মুন্ডা পাড়ায় এ ব্যাতিক্রমি স্কুলটির যাত্রা শুরু হয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে ওই গ্রামে বসবাসরত ৫ শতাধিক আদিবাসি (মুন্ডা) সম্প্রদায়ের ছেলে মেয়েদের দেশের প্রচলিত শিক্ষায় ব্যবস্থার আলোকে গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ বুঝিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে সদ্য অনার্স-মাস্টার্স শেষ করা আশিকুজ্জামান আশিক নামের এক তরুণ উদ্যোক্তা মুন্ডা সম্প্রদায়ের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে এমন উদ্যোগ নিয়েছেন। তার নিজের প্রতিষ্ঠিত ছোট্ট একটি সংগঠন ইনসিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভলপমেন্ট (আইসিডি)। আইসডি’র সহযোগীতায় এ অস্থায়ি শিক্ষা কেন্দ্রটি চালু করা হয়েছে। মুন্ডা শিশুরা যাতে ছোটবেলা থেকেই তাদের ইতিহাস ঐতিহ্য জানার পাশাপাশি পড়ালেখা শিখতে পারে সে জন্য এই স্কুল। অভাব অনাটনে থাকা মুন্ডা নারী পুরুষ দিনরাত পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করে। এ স¤প্রদায়ের অধিকাংশ বাবা মা নিরক্ষর হওয়ায় তাদের শিশুদের অক্ষর জ্ঞান ও পড়ালেখায় হাতেখড়ি দেয়ার গুরুত্ব তারা অনুধাবন করতে পারেনা। তাছাড়া ভাষাগত সমস্যার কারণে সঠিক দিক নির্দেশনার অভাবে তারা সবার সাথে খাপ খাইয়ে শিক্ষাগ্রহণ করতে পারেনা। এ জন্য স্কুলটিতে একজন মুন্ডা নারীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে স্কুলের প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণও রয়েছে।

আশিক বলেন, মুন্ডাদের কোলে পিঠেই বড় হয়েছি। শৈশব কৈশোর কেটেছে মুন্ডা ছেলে মেয়েদের সাথে। পড়াশোনা, খেলাধুলার সাথী ছিলো তারাই। নিজে গ্রামের স্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়া পর্যন্ত বিণামূল্যে তাদের পড়িয়েছি। মাতৃভাষার মতো তাদের মাতৃভাষাও বলতে শিখিয়েছি শৈশবেই। তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা অনুভব করি অনেক দিন থেকেই। আমার দেখা মতে, আমার গ্রামে এ পর্যন্ত মুন্ডা ছেলেমেয়েদের মধ্যে মাধ্যমিক পার করেছে মাত্র ২ জন। এতসব ভেবেই, গ্রামের দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত বাসন্তী মুন্ডাকে শিক্ষক হিসেবে মনোনীত করে তার বাড়ীতেই প্রাথমিকভাবে পাঠদান শুরু করা হয়েছে। সেখানে সরকারী স্কুলের পড়া প্রস্তুত করিয়ে দেয়ার পাশাপাশি মুন্ডা স¤প্রদায়ের ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে তাদের শিক্ষা দেয়া হবে। থাকবে সহ শিক্ষা কার্যক্রমও।

৬ নম্বর কয়রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ভবেষ মন্ডল বলেন, যুগ যুগ ধরে আদিম সভ্যতাকে আঁকড়ে চলে আসছে মুন্ডা সম্প্রদায়ের জীবন-যাপন। সংসার, সামাজিক আচার-বিচারে সমাজের অন্যদের থেকে সম্পুর্ন ভিন্নভাবে গড়ে ওঠা মুন্ডাদের সভ্যতায় ফেরাতে সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের সন্তানদের স্কুলমুখি করতেও চেষ্টা চলছে।

বিরসা মুন্ডা প্রভাতি স্কুলের শিক্ষিকা বাসন্তি মুন্ডা বলেন, ভাষা সংস্কৃতি ভিন্ন হওয়ায় স্কুলের প্রচলিত পাঠদান সম্পুর্ন আয়ত্বে আনতে পারে না আমাদের শিশুরা। ফলে মাঝ পথেই ঝরে পড়ে তারা। প্রাথমিকের গন্ডি পার হওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। এসব চিন্তা করেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সেখানে উপস্থিত অজয় মুন্ডা (৮), সুব্রত মুন্ডা (১০), সুমিতা মুন্ডা (৯) তাদের ভাষায় জানায়, তারা সকলেই লেখা পড়া শিখে গ্রামের অন্যন্য ছেলে মেয়েদের মত হতে চায়।

স্থানীয় ইউপি সদস্য হরেন্দ্রনাথ সরকার বলেন, গ্রামের একজন শিক্ষিত ছেলে মুন্ডাদের ছেলে মেয়েদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে এটা ভাবতেই ভাল লাগছে। তার এমন উদ্যোগকে জাগিয়ে রাখতে সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বন জানান তিনি।
কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিমুল কুমার সাহা বলেন, নিঃসন্দেহে এটি একটি ভাল উদ্যোগ। তবে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাথে সমন্বয় করে স্কুলটি চালাতে হবে। প্রয়োজনে উপজেলা প্রশাসন সার্বিকভাবে তাদের এ ধরনের উদ্যোগে সহযোগীতাও করবে।

 

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top