লোক দেখানো ইবাদত-বন্দেগির কোনো মূল্য নেই

bvbjbndjf.jpg

লোক দেখানো ইবাদত-বন্দেগির কোনো মূল্য নেই

পাঠকের চিন্তা, Prabartan | প্রকাশিত: ২০:৪১ পিএম, ১২-২-১৯

 

অনেকে মসজিদেই দেখা যায়, জুমাবারে মাইকে ইমাম সাহেব ঘোষণা করছেন, মসজিদের উন্নয়ন কাজ চলছে আপনাদের যার পক্ষে যা সম্ভব মুক্তহস্তে দান করবেন। আমরা মনে করি এ পর্যন্ত বলাতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু এরপরেই শুরু হয় নাম ধরে ধরে দাতাদের তালিকা তৈরি করার কাজ। অনেককেই হয়তো চলতি পথে অর্থাৎ মুসাফির অবস্থায় শুক্রবার জুমার নামাজে শরিক হতে হয়- সি বিষয়টি ইমাম সাহেবদের মাথায় রাখা দরকার।

কয়েকদিন আগে সোনারগাঁওএ পথের ধারে এক মসজিদে জুমার নামাজে শরিক হয়ে পড়ে গেলাম বেশ বিড়ম্বনায়। একদিকে আমাদের অনেক তাড়া ছিল মানে জরুরি একটা কাজ ছিল। হাতে সময়ও তেমন একটা ছিল না। ইমাম সাহেব প্রথমে দীর্ঘ একটা বয়ান দিলেন। এরপর শুরু করলেন দান খয়রাতের বয়ান। তারপর মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি নাম ধরে ধরে শুরু করলেন কে কত টাকা বা কে কত ব্যাগ সিমেন্ট দেবেন তার তালিকা তৈরি করতে। অমুক মিয়া পঞ্চাশ হাজার টাকা, মাশাআল্লাহ! অমুক সাহবে দশ হাজার টাকা! তমুক ৫০ ব্যাগ সিমেন্ট। এভাবে তালিকা তৈরির কাজ চলতেই থাকলো! নামাজের সময় পার হয়ে দুটো বাজতে চলল। টাকা আদায় চলতেই থাকলো। ইমাম সাহেব অবশ্য মাঝে মাঝে দুঃখ প্রকাশ করে সান্ত্বনার বাণী শোনাচ্ছিলেন। দশ বিশ পঞ্চাশ যে পারেন দান করেন। এক টাকা দান করলে সাতশ টাকার সওয়াব! একে একে সবাইকে ঘোষণা দিতে হচ্ছে টাকার পরিমাণ। মুসাফিররাও বাদ যাচ্ছেন না। এক পর্যায়ে একজন মুসাফির বলতে বাধ্য হলেন, আমাদের তাড়া আছে দয়া করে নামাজ শুরু করুন!

ইদানীং আরো অনেক ক্ষেত্রে দান-খয়রাতের ব্যাপারে এক ধরনের জোর-জবরদস্তি লক্ষ্য করা যায়! আমরা জানি সব সময় সবার অর্থনৈতিক অবস্থা এক রকম থাকে না। সে জন্য দান-খয়রাতের ব্যাপারে কাউকে বাধ্য করা বা জোর-জবরদস্তি করা উচিত নয়। যে কারণে মুসাফিরকে জাকাতের অর্থ প্রদান করতে বলা হয়েছে। যেখানে ‘ডান হাতে দান করলে বাম হাতে যেন না জানে- এমন কথা বলা হয়েছে, সেখানে দান-খয়রাতের ব্যাপারে জোর-জবরদস্তির কোনো সুযোগ নেই। যতদূর সম্ভব গোপনে দান করাই উত্তম। তাই আমাদের লোক দেখানো কাজ থেকে দূরে থাকা উচিত।

সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। নবী করিম (সা.) বলেছেন, এরূপ সাতজন ব্যক্তিকে সেদিন আল্লাহ তার সুশীতল ছায়াতলে স্থান দেবেন, যেদিন তার ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়াই থাকবে না। … যে ব্যক্তি অত্যন্ত গোপনভাবে দান-খয়রাত করে, এমনকি তার ডান হাতে যা কিছু দান করে তার বাম হাতও তা জানতে পারে না। এরূপ ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং দু’চোখে অশ্রু ঝরাতে থাকে। -সহিহ বোখারি ও মুসলিম

হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, তুমি লোক দেখানো কাজ করা থেকে বিরত থাকো। কেননা রিয়া বা লোক দেখানো কাজ হচ্ছে ছোট শিরক। যে ব্যক্তি লোক দেখানো কাজে লিপ্ত থাকবে, কিয়ামতের দিন সবার সামনে তাকে চারটি বিশেষ নামে তাকে ডাকা হবে, ১. হে রিয়াকারী, ২. হে বিশ্বাসঘাতক, ৩. হে অবাধ্য, ৪. হে ক্ষতিগ্রস্ত। তারপর বলা হবে, হে ধোঁকাবাজ! তোমার আমলসমূহ বাতিল হয়ে গেছে, তোমার প্রতিদান নষ্ট হয়ে গেছে, আমার কাছে তোমার কোনো কিছুই পাওনা নেই। তুমি যে উদ্দেশ্যে বা যার জন্য কাজ করেছ যাও তার কাছে গিয়ে তোমার পাওনা বুঝে নাও। -সহিহ বোখারি

অন্য এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, এক ব্যক্তি হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে জানতে চেয়েছিল যে, মুক্তি কিভাবে পাওয়া যাবে! তিনি বললেন, আল্লাহকে যদি ধোঁকা না দাও তাহলে মুক্তি পাবে। লোকটি বললো, আল্লাহকে ধোকা দেয়ার অর্থ কি? রাসূল (সা.) বললেন, যে কাজ তোমাকে আল্লাহ ও তার রাসূল করতে বলেছেন, সে কাজ যদি তুমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে খুশি করার জন্য কর, তাহলে সেটাই হবে আল্লাহকে ধোকা দেয়ার শামিল। -সহিহ বোখারি

অতএব, আমাদের উচিত হবে লোক দেখানোর জন্য কোনো কাজই না করা।

আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সাক্ষাৎ কামনা করে তার উচিত হবে সৎ কাজ করা এবং নিজ প্রতিপালকের ইবাদতে আর কাউকে শরিক না করা। অর্থাৎ সৎ কাজসমূহ কাউকে দেখানোর উদ্দেশ্যে করা উচিত নয়।

হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা ছোট শিরক থেকে দূরে থাক। সাহাবীগণ জানতে চাইলেন, ছোট শিরক কী? তিনি বললেন, রিয়া অর্থাৎ লোক দেখিয়ে সৎ কাজ করা। যেদিন আল্লাহ তার বান্দাদেরকে কর্মফল দেবেন, সেদিন তাদেরকে বলবেন, যাদেরকে দেখিয়ে দেখিয়ে দুনিয়ায় তোমরা ভালো কাজ করতে, আজ তাদের কাছে যাও। দেখ, তারা তোমাদেরকে কোনো প্রতিদান দিতে পারে কি না। -আহমাদ ও বায়হাকি

আর একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (সা.) বলেন, আল্লাহতায়ালা বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো কাজ করে এবং সেই কাজে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে শরিক করে, তার ওই কাজ যাকে সে শরিক করেছে তার জন্য। সে কাজের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। -সহিহ মুসলিম

হজরত রাসূল (সা.) আরো বলেছেন, যে ব্যক্তি মানুষকে ভালো কাজের ব্যাপারে লোক দেখানো আচরণ করে, আল্লাহও তার সাথে লোক দেখানো আচরণ করেন। -বোখারি ও মুসলিম

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, অনেক রোজাদার এমন আছে, যার রোজা থেকে ক্ষুধা ও পিপাসা ছাড়া আর কিছু অর্জিত হয় না। আর অনেক নামাজী আছে যারা রাত জেগে নামাজ পড়ে, যাদের রাত জাগাই সার হয়। অর্থাৎ নামাজ ও রোজা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে না করা হলে তার জন্য কোনো সওয়াব হবে না। -ইবনে মাজা

মহান আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, তাদের কৃতকর্মের কাছে আমি উপস্থিত হবো এবং তাকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণা বানিয়ে দেব। অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে মানুষ যে কাজ করবে, আল্লাহ তার সওয়াব নষ্ট করে দেবেন।

আদী বিন হাতেম বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা.) বলেছেন, কিছু সংখ্যক লোককে কিয়ামতের দিন বেহেশতে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হবে। তারা যখন বেহেশতের খুব নিকটে চলে যাবে এবং তারা তার সুঘ্রাণ পাবে,তারপর তারা বেহেশতের ভেতরের স্থাপনাসমূহ ও অন্যন্য অজস্র নিয়ামত দেখতেও পাবে, তখন ফেরেশতাদের ডেকে বলা হবে, এদেরকে এখান থেকে ফেরত নিয়ে চলে যাও। কেননা বেহেশতের এসব নিয়ামতে এদের কোনো অধিকার নেই। তখন তারা চরম হতাশা ও অনুশোচনা নিয়ে ফিরে আসবে। তারপর তারা বলবে, হে আল্লাহ! তোমার প্রিয়জনদের জন্য যে নিয়ামত তুমি নির্দিষ্ট করে রেখেছ তা দেখানোর আগে যদি আমাদেরকে জাহান্নামে পাঠাতে, তাহলে পতা আমাদের জন্য তা অনেক সহজ হতো। আল্লাহ বলবেন, আমি তোমাদের সাথে এই আচরণই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কারণ তোমরা যখন একা থাকতে, তখন আমার প্রতি চরম অবাধ্য আচরণ করতে। আর যখন ভালো মানুষের সাথে মেলামেশা করতে, তখন তাদের সাথে আল্লাহভীরু লোকদের মতো আচরণ করতে। অতএব, নিজেদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মানুষের সাথে থাকার সময় যে মানসিকতা তোমরা প্রকাশ করতে, একান্তে থাকার সময় আমার প্রতি সেই আন্তরিকতা আর সেই মানসিকতা তোমরা পোষণ করতে না। তোমরা মানুষকে ভয় করতে, আল্লাহকে ভয় করতে না। তোমরা মানুষকে গুরুত্ব দিতে, আল্লাহকে গুরুত্ব দিতে না। লোক দেখানোর জন্য তোমরা ত্যাগ স্বীকার করতে, আল্লাহর জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে না। তাই আমি আল্লাহ আজ তোমাদেরকে আমার অগাধ প্রতিদান থেকে শুধু বঞ্চিতও করবো না, চরম যন্ত্রণাদায়ক শাস্তিও প্রদান করবো।

 

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top