দুইভাবে প্রশ্নফাঁসের জালিয়াতি

cid20190131200109.jpg

দুইভাবে প্রশ্নফাঁসের জালিয়াতি

ডেস্ক, Prabartan | আপডেট: ৮:১৪ পিএম, ৩১-০১-১৯

 

ভর্তি ও নিয়োগ পরীক্ষায় মূলত দুইভাবে জালিয়াতি হয়। একটি চক্র প্রশ্নফাঁস করে, অন্য চক্রটি পরীক্ষার দিন প্রশ্ন সংগ্রহ করে সমাধান বের করে। এর পর ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে তা পরীক্ষার্থীদের সরবরাহ করে বলে জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

নিয়োগ ও ভর্তিতে প্রশ্নফাঁস এবং ডিজিটাল জালিয়াতের দুই আলাদা চক্রকে আইনের আওতায় এনেছে সিআইডি। সর্বশেষ ডিজিটাল ডিভাইস জালিয়াত চক্রের মূল হোতা হাফিজুর রহমান হাফিজ ও মাসুদ রহমান তাজুলসহ এখন পর্যন্ত দু’টি চক্রের ৪৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৩১ জানুয়ারি) দুপুরে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নফাঁসের এসব আদ্যোপান্ত তথ্য জানান সিআইডির প্রধান অ্যাডিশনাল আইজিপি হিমায়েত হোসেন।

তিনি বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে সিআইডি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছিল। এই কাজে আমরা অনেকটাই সফল হয়েছি। সিআইডি এ পর্যন্ত ৪৬ জনকে গ্রেফতার করেছে। সিআরপিসি অনুযায়ী তাদের জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। এতো আসামি জবানবন্দি দিয়েছে তার কোনো ইতিহাস নেই।

গত পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রশ্নফাঁস দেশ তুমুল আলোচিত বিষয়। তবে গত বছর এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্ন আগেভাগে আসেনি সামাজিক মাধ্যমে। এর আগে এসএসসি পরীক্ষা চলাকালে প্রচুর গ্রেফতার হয়।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, ২০১৭ সালের ১৯ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’টি হলে অভিযান চালিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও জালিয়াতি চক্রের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে রানা ও মামুন নামের দুই শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার করা হয়। এ ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় একটি মামলা করা হয়।

তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য থেকে পরীক্ষার হল থেকে গ্রেফতার করা হয় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী রাফিকে। এরপর তাদের তথ্যমতে প্রযুক্তি অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রশ্ন পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হওয়া সাত শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার করে সিআইডি।

এ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জানা যায়, পরীক্ষার আগেই প্রেস থেকে ফাঁস হয়ে যেত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্ন। এ চক্রের মাস্টারমাইন্ড নাটোরের ক্রীড়া কর্মকর্তা রাকিবুল হাসান এছামী, প্রেস কর্মচারী খান বাহাদুর, তার আত্মীয় সাইফুল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বনি ও মারুফসহ ২৮ জন। তাদের গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে এ চক্রের মূলোৎপাটন করা হয়।

সংঘবদ্ধ চক্রটি ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে এবং সাভারের একটি বাসায় আগের রাতে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের পড়াতেন বলে তিনি জানান।

মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ তদন্ত শেষে আমরা দেখেছি, ভর্তি কিংবা নিয়োগ পরীক্ষায় দুইভাবে জালিয়াতি হয়। একটি চক্র আগের রাতে প্রেস থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে। অন্য চক্রটি পরীক্ষা শুরুর কয়েক মিনিট আগে বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে প্রশ্নপত্র নিয়ে দ্রুত তা সমাধান করে ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীদের সরবরাহ করে। আগের রাতে প্রেস থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁসকারী পুরো চক্র চিহ্নিত করা গেলেও ডিভাইস চক্রটি বাকি ছিল।

প্রেস বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান যারা এনালগ পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে তাদের আইনের আওতায় আনা ততোটাই জটিল। কিন্তু সিআইডি প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে বদ্ধপরিকর ছিল। ফলে টানা সাঁড়াশি অভিযানে নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতি চক্রের মাস্টার মাইন্ড বিকেএসপির সহকারী অলিপ কুমার বিশ্বাস, মূলহোতা ৩৮তম বিসিএসের নন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত ইব্রাহিম মোল্ল্যা বিএডিবির সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল আইয়ুব আলী বাঁধনসহ নয়জনকে গ্রেফতার করে সিআইডি।

এ চক্রটি গত কয়েক বছর ধরে বিসিএস পরীক্ষাতেও জালিয়াতি করেছে বলেও জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার বলেন, পরীক্ষার কেন্দ্র থেকে পরীক্ষার শুরুর কয়েক মিনিট আগে প্রশ্নপত্র সরবরাহের অভিযোগে রাজধানীর অগ্রণী স্কুলের ইংরেজির শিক্ষক গোলাম মোহাম্মদ বাবুল, অফিস সহায়ক (পিওন) আনোয়ার হোসেন মুজমদার এবং নূরুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়।

একই অভিযোগে ধানমন্ডি গভর্নমেন্ট বয়েজ স্কুলের সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক হোসনে আরা বেগম এবং পিওন হাসমত আলী শিকদারকেও গ্রেফতার করে সিআইডি।

গ্রেফতারের সময়ে হাসমতের কাছ থেকে ওইদিনের বিসিএস লিখিত পরীক্ষার কয়েক কপি প্রশ্নপত্র এবং ৬০ হাজার টাকা পাওয়া যায়। অলিপ, ইব্রাহিম, মোস্তফা, তাজুল, হাফিজ ও বাঁধন ডিভাইস জালিয়াতির এ ছয় মূলহোতার প্রত্যেককের আবার নিজস্ব সহযোগী চক্র ছিল।

সর্বশেষ অভিযানে এদের কয়েকজন সহযোগীকেই গ্রেফতার করা হয়। অলিপের অন্যতম সহযোগী অগ্রণী ব্যাংকের ক্যাশ অফিসার জাহাঙ্গীর আলম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী সাঈদুর রহমান সাঈদ, তাজুলের প্রধান সহযোগী ঢাকা কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী অসীম বিশ্বাস মুম্বাই থেকে পরীক্ষায় জালিয়াতির কয়েকশত ডিভাইস আমদানি করেছে।

সিআইডির এ কর্মকর্তা বলেন, সর্বশেষ অভিযানে জনতা ব্যাংকের জেষ্ঠ কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান হাফিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবদুর রহমান, একই বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাঈদুর রহমান সাঈদ, চতুর্থ বর্ষের মোহায়মিনুল ইসলাম গ্রিন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী রিমন হোসেন, ব্যবসায়ী মাসুদুর রহমান তাজুল, অগ্রণী ব্যাংকের ক্যাশ অফিসার জাহাঙ্গীর আলম, ঢাকা কলেজের পিওন মোশাররফ হোসেন মোশা এবং ঢাকা কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী অসিম বিশ্বাস।

এ ঘটনায় অভিযুক্তদের ৩০ কোটি টাকার সম্পদের খোঁজ পায় সিআইডি। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও কাজ চলছে। তাদের বিরুদ্ধে মানিলান্ডরিংয়ের মামলা করা হয়েছে।

 

বাংলাদেশ সময়: ২০১৪, ৩১ জানুয়ারি ২০১৯

ডেস্ক/এএস

 

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top