ইসলামে মৃতদেহের সম্মান ও সুরক্ষা

1674530088-34de71583495f082f1e802a05d7d8d51.webp

ডেস্ক রিপোর্ট : সৃষ্টিজগতে সম্মানিত ও মর্যাদাবান জীব মানুষ। মানবজাতির প্রতি সম্মান জানিয়ে পৃথিবীতে মানুষের প্রয়োজনীয় সব কিছুর ব্যবস্থা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি আদমের সন্তানকে সম্মান দিয়েছি, স্থলে ও সমুদ্রে তাদের চলাচলের জন্য বাহন দিয়েছি, তাদের উত্তম রিজিক দিয়েছি এবং যাদের সৃষ্টি করেছি, তাদের অনেকের ওপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।’ (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৭০)

মানুষ সর্বাবস্থায় সম্মানিত : ব্যক্তির সম্মান ও মর্যাদা শুধু জীবিত অবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মৃত্যুর পরও এ সম্মান অব্যাহত থাকবে। ইসলামী আইনের একটি নীতি হলো, ‘মানবসন্তান জীবিত বা মৃত হোক সম্মানের পাত্র বলে গণ্য হবে।’ (আল মাবসুত : ৫৯/২)

এ জন্যই জীবিত মানুষের মতো মৃত মানুষেরও ‘সতর’ তথা নারী ও পুরুষের সুনির্দিষ্ট অঙ্গ ঢেকে রাখা আবশ্যক। এমনকি মৃত্যুর পর গোসলের সময় সতর ঢেকে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যাতে মৃত ব্যক্তির সম্মান অটুট থাকে। একই কারণে অপ্রয়োজনে মৃতদেহ বিকৃত করা বা অঙ্গহানি করা ইসলামী শরিয়তে নিষিদ্ধ।

মৃতদেহের সুরক্ষায় মহানবীর নির্দেশনা

বিভিন্ন হাদিসে মরদেহের সুরক্ষা নিশ্চিত ও অঙ্গহানি থেকে কঠোরভাবে বারণ করা হয়েছে।

মৃতের হাড় ভেঙে ফেলা নিষিদ্ধ :  রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কোনো মৃত ব্যক্তি হাড় ভেঙে ফেলা জীবিত অবস্থায় হাড় ভেঙে ফেলার মতো পাপ।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩২০৭)

আনাস বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) তাঁর খুতবায় বেশি বেশি সদকা করতে উৎসাহ দিয়েছেন এবং অঙ্গহানি থেকে নিষেধ করেছেন।’ (নাসায়ি, হাদিস : ৪০৪৭)

আলী (রা.)-এর ঘাতক ইবনে মুলজিম প্রসঙ্গে নিজ সন্তান হাসানকে বলেছেন, ‘আমি বেঁচে থাকলে তার ব্যাপারে আমি রায় দেব। তার আঘাতে আমার মৃত্যু হলে তাকে হত্যা করবে। তবে তার অঙ্গহানি করবে না। কারণ আমি শুনেছি রাসুল (সা.) অঙ্গহানি থেকে বারণ করেছেন এমনকি পাগলা কুকুরের ক্ষেত্রেও।’ অন্য বর্ণনা মতে তিনি ঘাতক ইবনে মুলজিমের ব্যাপারে বলেছেন, ‘তোমরা তাকে আহার করাও, পান করাও, তার সঙ্গে সুন্দর আচরণ করো। বেঁচে থাকলে আমিই আমার রক্তের অভিভাবক। চাইলে ক্ষমা করব কিংবা চাইলে বন্দি করব। আমি মারা গেলে তোমরা তাকে হত্যা করবে। তার অঙ্গহানি করবে না।’ (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ, হাদিস : ১০৪৯৩)

আরও পড়ুন : নাশকতা মামলায় কারাগারে সাতক্ষীরার পৌর মেয়র

যদি একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির অঙ্গহানি করা না যায়, তবে একজন নিরাপরাধ ব্যক্তির ক্ষেত্রে তা কতই না গুরুতর।

অমুসলিমরাও সম্মান পাবে : আল্লামা ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেছেন, ‘ইসলামী শরিয়তে মানবসত্তা সর্বাবস্থায় সম্মানিত। এতে মুসলিম-অমুসলিমের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তার মানে জীবতদের মতো মৃত ব্যক্তির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ভেঙে ফেলার অনুমতি নেই; বরং পুরো দেহের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সবার কর্তব্য।’ (ফাতওয়া শামি : ৬/২২৯-৩১৩)

মৃতের প্রতি জীবিতের দায়িত্ব

ইসলামী শরিয়তে দাফনের আগ পর্যন্ত মৃতের দৈহিক মর্যাদা সুনিশ্চিত করা জীবিতদের দায়িত্ব। তেমনি দাফনের পর কবরস্থানের দেখাশোনা করাও সবার কর্তব্য। জীবিতাবস্থার মতো মারা যাওয়ার পরও মৃতদেহের সম্মান ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা জীবিতদের কর্তব্য। তাই মৃত ব্যক্তিকে সযত্নে কাফন দেওয়া, জানাজা ও দাফনের ব্যবস্থা করা মুসলিম সমাজের অত্যাবশ্যকীয় একটি বিধান। মৃতদের কবর দেওয়ার স্থানও সংরক্ষণ করা অতি জরুরি। কবরস্থানের অসম্মান হয়—এমন কাজ থেকে বিরত থাকা কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি তাকে (মানুষকে) মৃত করেন এবং কবরস্থ করেন।’ (সুরা আবাসা, আয়াত : ২১)

মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়া : গোসল মৃত ব্যক্তির অন্যতম অধিকার। পৃথিবীতে সর্বপ্রথম আদম (আ.)-কে মৃত্যুর পর ফেরেশতারা গোসল দিয়েছেন। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আদম (আ.)-কে ফেরেশতারা পানি ও বরইপাতা দিয়ে গোসল দিয়েছেন। তারা তাঁকে কাফন দিয়েছে, ‘লাহদ’ কবরে তাঁকে দাফন করেছে এবং তারা বলেছে, হে আদমের সন্তানরা, মৃতদের ব্যাপারে এটা তোমাদের সুন্নত তথা করণীয়।’ (তাবরানি, হাদিস : ৮২৬১)

কবর খনন করা : মৃত ব্যক্তির জন্য কবর খনন করা সাওয়াবের কাজ। তেমনি গোসল দেওয়া, দোষ-ত্রুটি গোপন রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে মৃতের গোসল দেয় ও তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখে, আল্লাহ তাকে ৪০ বার ক্ষমা করেন। আর যে ব্যক্তি মৃতকে কাফন পরায়, আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতের রেশমের কাপড় পরিধান করাবেন। যে ব্যক্তি মৃত ব্যক্তির জন্য কবর খনন করে তাতে কবর দেয়, আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামত পর্যন্ত মৃতের জন্য ঘরের বসবাসের ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিদান দেন।’ (মুসতাদরাকে হাকিম, ১/৫০৫)

কবরস্থানের সম্মান নিশ্চিত করা : কবরের ওপর বসা ও মলমূত্র ত্যাগ করা অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ। এমনকি কবরের ওপর দিয়ে হাঁটা-চলা করা ও হেলান দেওয়াও নিষিদ্ধ। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) কবরের ওপর আবরণ দিতে (প্লাস্টার করতে), কবরে লিখতে, তার ওপর দালান নির্মাণ ও হাঁটা-চলা করতে নিষেধ করেছেন।’ (মুসলিম, হাদিস ৮৯১১)

অন্যত্র রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘কবরের ওপর বসার চেয়ে কাপড় ও চামড়া পুড়িয়ে ফেলা জ্বলন্ত অঙ্গারের ওপর বসা তোমাদের জন্য অনেক ভালো।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩২২৮)

কবর থেকে চুরি করা পাপ :  কবর দেওয়ার পর আবার কবর খুঁড়ে মৃতদেহ থেকে কাফন, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ইত্যাদি কেটে নেওয়া জঘন্য পাপ। কেননা এর দ্বারা মৃত ব্যক্তিকে লাঞ্ছিত করা হয়। আমরাহ বিনতে আবদুর রহমান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) মৃতদের কাফন চুরি করে এমন নারী-পুরুষদের অভিশাপ দিয়েছেন।’ (মুসতাদরাক আল হাকিম, হাদিস : ১৪১৯)। মহান আল্লাহ আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতে সফলকাম করুন।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top