খুলনা শহর ঘিরে শতাধিক অবৈধ আবাসন প্রকল্প

IMG_20230122_162132-1.jpg

নিজস্ব প্রতিবেদক: খুলনায় নির্মাণাধীন নতুন জেলখানার পেছনে রয়েছে জলাভূমি। সেখানে তাকালে দেখা মিলবে জলাভূমির মধ্যে টাঙানো রয়েছে সারি সারি সাইনবোর্ড। স্থানটি নির্ধারণ করা হয়েছে মহানগর আবাসিক প্রকল্প হিসেবে।

স্থানীয়রা জানান, ২০১৯ সালেও সেখানে চলত কৃষিকাজ। পরে সেখানে জমি কেনা শুরু করে বিসমিল্লাহ প্রোপার্টিজ নামের একটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। একদিকে তারা প্লট আকারে জলাভূমি বিক্রি শুরু করে, অন্যদিকে বালু ফেলে সেখানে ভরাট করতে থাকে।

শুধু বিসমিল্লাহ প্রোপার্টিজ নয়, শহরের ক্রমবর্ধমান এলাকায় এমন শত শত জমি কেনাবেচার ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। যাদের রয়েছে এক বা একাধিক আবাসন প্রকল্প। এর সবই করা হচ্ছে কৃষিজমি ও জলাশয় ভরাট, নদী দখল এবং গাছপালা উজাড় করে।

খুলনা শহরের সীমানাঘেঁষা সিটি বাইপাস রোড ও সিটি আউটার বাইপাস রোডের দুই পাশে গড়ে উঠেছে এসব প্রকল্প। নিয়মনীতি না মানায় এর মধ্যে একটি প্রকল্পকেও অনুমোদন দেয়নি খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ)।

এসব প্রকল্পের প্লট বিক্রিতেই ব্যবসায়ীরা আশ্রয় নিচ্ছেন নানা রকমের প্রতারণার। মন ভুলানো চটকদার বিজ্ঞাপন, কিস্তিতে টাকা পরিশোধের উপায়, কেডিএ থেকে প্ল্যান পাসের সহায়তাসহ ক্রেতাদের নানাভাবে ম্যানেজ করে প্লট বিক্রি করা হয়।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের লবণচরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এনামুল হক বলেন, আবাসন ব্যবসায়ী ও জমির ক্রেতারা প্রায় ঝামেলায় জড়ান। ক্রেতাদের নানা রকমের প্রলোভনে ব্যবসায়ীরা জমি বিক্রির চুক্তি করে টাকা নেন। পরে দলিল হস্তান্তরের সময়ে দাম বেশি চান। এই রকম নানা অভিযোগ থানাতে আসে।

একাধিক প্রকল্প কর্মকর্তা ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাত্র ৩ থেকে ৪ বছর আগেও ওই সব স্থানে জমির দাম ছিল প্রতি শতক ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। তবে এখন আবাসন ব্যবসায়ীদের দখলে জমি চলে যাওয়ায় প্রতি শতক বিক্রি করা হচ্ছে সাড়ে ৩ লাখ থেকে ৯ লাখ টাকা পর্যন্ত দরে।

বিসমিল্লাহ প্রোপার্টিজের মহানগর আবাসিক প্রকল্পের প্রজেক্ট নির্বাহী ইকবাল আহমেদ বলেন, এখানকার প্রতি শতক জমির দাম ৬ লাখ টাকা। প্রকল্পে প্রায় ২৫০ বিঘা জমি রয়েছে। প্রায় ৫০০ জনের কাছে জমি প্লট আকারে বিক্রি করা হয়েছে। আগে এই জমি জলাভূমি ছিল। তারা গত দুই বছর ধরে বালু ফেলে ভরাট করে যাচ্ছেন।

বালু ফেলা জলাভূমি ফেলতে প্রশাসনের অনুমতি নেয়া হয় কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ইকবাল আহমেদ বলেন, ‘এখানে সবাই এভাবে জমি ভরাট করেন। আমরা তো মানুষের বসবাসের জায়গা বানিয়ে দিচ্ছি।’

এ রকম আরও অবৈধ প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে মীরবাগ আবাসন, গোল্ডেন সিটি, ইমা আবাসন, আরাফাত আবাসিক, সিটি আবাসিক, সুলাইমান প্রোপার্টিজ, মুন রিয়েল স্টেট। এসব আবাসনের অধিংকাশ পড়েছে খুলনা শহরসংলগ্ন ডুমুরিয়া উপজেলার গুটুদিয়া ইউনিয়নের মধ্যে।

ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শেখ তুহিনুল ইসলাম তুহিন বলেন, ‘এসব ভূমি ব্যবসায়ী কোনো আইন মানেন না। নিয়ম মোতাবেক আমাদের ট্যাক্স পরিশোধ ও ট্রেড লাইসেন্সও নেয় না। ইতিমধ্যে আমাদের আওতাধীন এলাকার প্রায় ৫০টি সরকারি খাল তারা দখলে নিয়ে নিয়েছে। আর খাসজমি কত শত বিঘা তাদের দখলে রয়েছে, এর কোনো হিসাব নেই। তাদের ইচ্ছামতো সরকারি জমির গাছপালা উজাড় করে রাস্তা তৈরি করছে, খালের জায়গা দখল করে ভরাট করছে, পুল-কালভার্ট তৈরি করছে। এসব নিয়ে আমরা কথা বলতে গেলে তারা একটি মামলা করে দেয়। পরে সেই মামলার কপি দেখিয়ে সরকারি জমি দখল করে রাখে। তারা প্রচণ্ড প্রভাবশালী হওয়ায় আমাদের কিছু করার থাকে না।’

কেডিএ পরিকল্পনা বিভাগ সূত্র জানায়, খুলনা শহরের আশপাশে মোট ১০৮টি অবৈধ আবাসন প্রকল্প রয়েছে। যার মধ্যে একটিকেও অনুমোদন দেয়া হয়নি।

কেডিএর আওতাধীন এলাকায় জমি ব্যবসা পরিচালনা করতে হলে রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইনে মোতাবেক প্রথমে কেডিএ থেকে নিবন্ধন নিতে হয়। এর জন্য ট্রেড লাইসেন্স, ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) সার্টিফিকেট, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) রেজিস্ট্রেশন নম্বর, প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা ও কারিগরি ব্যক্তিদের যোগ্যতার প্রমাণপত্র (স্থপতি, প্রকৌশলী ও পরিকল্পনাবিদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানের সদস্যপত্রের সনদ) থাকতে হয়। এসব কাগজ পর্যালোচনা করে কেডিএ থেকে নিবন্ধন দেয়া হয়।

কেডিএ চেয়ারম্যান এস এম মিরাজুল ইসলাম বলেন, খুলনা শহরের অনেক এলাকা এখনো অপরিকল্পিত রয়েছে। আর নতুনভাবে যেসব এলাকা গড়ে উঠবে, তা পরিকল্পিত না হলে বসবাসের উপযোগী হবে না। তাই আইন মোতাবেক না হওয়ায় তারা কোনো আবাসন প্রকল্পকে এখনো অনুমোদন দেননি।

তবে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়ক মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, নগরীতে পরিকল্পিত উন্নয়নের দায়িত্ব কেডিএর। তাই অবৈধ আবাসনের কার্যক্রম নিরসনের মূল ভূমিকা কেডিএকেই পালন করতে হবে। ইতিমধ্যে আবাসন ব্যবসায়ীদের সরকারি খাল দখলের কারণে শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। এখন সামান্য বৃষ্টিতেই শহরে জবাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top