খুলনায় হত দরিদ্রদের ৪০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

6458496_New-Project-41.jpg

নিজস্ব প্রতিবেদক : খুলনার কয়রা উপজেলায় হত দরিদ্রদের জন্য কর্মসৃজন কর্মসূচীর ২৫৩৩ জন উপকারভোগীর ৮ দিনের মজুরির ৪০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ প্রকল্পের ৪০ দিনের কাজ ৩১ দিনে শেষ করা হয়েছে। প্রকল্পের উপকারভোগীরা ৩১ দিনের হিসাবে মজুরি পাবেন। বাকি ৯ দিনের মধ্যে ৮ দিনের মজুরির টাকা যাচ্ছে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার পকেটে। একদিনের মজুরির অর্থ ফেরৎ পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া এ প্রকল্পের আওতায় নন-ওয়েজ ফান্ডের অর্থও ব্যয় করা হয়নি। এমন অভিযোগ প্রকল্পের উপকাভোগীদের।

অবশ্য উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সাগর হোসেন সৈকত প্রকল্পে ৩৯ দিন কাজ হয়েছে বলে দাবী করেছেন। পরে মুঠোফোনে তিনি বলেছেন, ‘এ উপজেলায় নতুন যোগদান করার পর ‘অনেক কিছু’ সম্পর্কে বুঝতে একটু দেরি হচ্ছে। আশা করছি ভবিষ্যতে এমন ভুল হবে না।’ প্রকল্পের উপকারভোগীদের ৮ দিনের মজুরি ফেরৎ পাঠানোর ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি কিছুই বলতে চাননি।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২০২১ অর্থ বছরে অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসৃজন কর্মসূচির আওতায় ১ম পর্যায়ে কয়রা উপজেলায় ২৫৩৩ জন উপকারভোগীর ৪০ দিনের মজুরি হিসাবে ২ কোটি ২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়। এছাড়া উপকারভোগীদের মজুরির বাইরে ‘নন-ওয়েজ’ ফান্ডের আরো ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে ৩০টি প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসব উপকারভোগীদের দৈনিক ২শ টাকা মজুরি হিসেবে কাজ করানো হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ি উপকারভোগীদের জবকার্ডের মাধ্যমে সপ্তাহ শেষে প্রত্যেকে নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা তুলে নেওয়ার কথা। কিন্তু তাদেরকে পিআইসির বাড়ি থেকে টাকা নিতে হয়েছে। খাতা কলমে গত ২৪ অক্টোবর এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে ৩০ ডিসেম্বর কাজ শেষ দেখানো হয়েছে। অথচ শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ি ডিসেম্বরের ১৫ তারিখে কাজ শেষ করা হয়েছে। সে অনুযায়ি প্রথমে উপকারভোগীদের ২৪ দিনের মজুরি ছাড় করা হয়। পরে ১৫ দিনের মজুরি ছাড় করা হয়েছে। এর মধ্যে উপকারভোগীরা পাবেন সাত দিনের টাকা। বাকি ৮ দিনের ৪০ লাখ ৫২ হাজার ৮০০ টাকা যাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের পকেটে।

এদিকে উপকারভোগীরা জানিয়েছেন, তারা এ কর্মসূচির আওতায় গত ৩১ অক্টোবর থেকে কাজ শুরু করে সপ্তাহের শুক্র ও শনিবার বাদে মোট ৩১ দিন কাজ করেছেন। এ পর্যন্ত তাদেরকে ১৮ দিনের মজুরি পরিশোধ করা হয়েছে। তাদের দৈনন্দিন কাজের মজুরি হিসেবে ২শ টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও অনেকেই তা পাননি। তাদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, ১৮ দিনের মজুরি হিসেবে ৩৬ শ টাকার স্থলে ২৪ শ টাকা দেওয়া হয়েছে।

উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নে এ প্রকল্পের আওতায় ২০৮ জন উপকারভোগী কাজ করেছেন। ওই প্রকল্পের উপকারভোগী আরতি মুন্ডা বলেন, ‘আমরা মোটমাট ৩১ দিন করতি পারিছি। এর মধ্যি মেম্বার আমাগে ২৪শ টাকা দেছে। বাকি টাকা চাতি গেলি আজ না কাল করে ঘোরাচ্চে।’

একই প্রকল্পের আরেক উপকারভোগী পানপতি মুন্ডা বলেন, ‘সরকার আমাগের জন্যি কাজের মাধ্যমে যে টাকার বেবস্তা করেচে তার বেশিরভাগ টাকা থেকে আমরা বঞ্চিত হই। আমাগি এলাকা এখন নোনা পানিত ডুবে আছে। কাজ নেই, খাব কি।’

দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও ইউপি সদস্য রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আমার প্রকল্পে ৬০ জন শ্রমিক ৪০ দিন কাজ করেছে। তাদের টাকা তুলতে বেগ পাতি হয়। অথচ কয়রা সদর ইউনিয়নে মাত্র ২৫ দিন কাজ হয়েছে তাগের বেলায় কারো কোন অভিযোগ নেই।’ খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে তার প্রকল্পে ৭৫ জন উপকারভোগী কাজ করা কথা। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি এ প্রতিবেদকের সাথে দেখা করার কথা বলেন।
বাগালি ইউনিয়ন পরিষদের একজন ইউপি সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, তাদের ইউনিয়নে যে প্রকল্পগুলি বাস্তবায়ন হয়েছে তার প্রতিটিতে উপকারভোগীর সংখ্যা কম রয়েছে। ওই প্রকল্পের উপকারভোগীরা জানিয়েছেন তারা কেউ ৩১ দিন কেউ ৩০ দিন আবার কেউ ২৫ দিন কাজ করেছেন।

একই অভিযোগ পাওয়া গেছে কয়রা সদরসহ অন্যন্য ইউনিয়নের প্রকল্পে। প্রতিটি প্রকল্পে উপকারভোগীর সংখ্যা এবং দিন কমিয়ে খাতা কলমে সব ঠিক রাখা হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন এলাকায় সাইনবোর্ড থাকার কথা থাকলেও কোথাও তা দেখা যায়নি। এছাড়া উপকারভোগীদের কারো কাছে জব কার্ড পাওয়া যায়নি। মহারাজপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের একটি প্রকল্পের সভাপতি বলেন, উপকারভোগীদের মজুরির টাকা আত্মসাত করতে প্রকল্পের মেয়াদ কমানো হয়েছে। প্রতিবাদ করেও লাভ হচ্ছে না।

এ প্রসংগে কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, ‘তাঁর (পিআইও) ব্যাপারে অনেকেই অভিযোগ করেছেন এবং এর সত্যতা পেয়েছি। এ জন্য তাঁকে ডেকে সতর্ক করা হয়েছে। তিনি তার ভুল স্বীকার করে ভবিষ্যতে এমন করবেন না বলে জানিয়েছেন।’

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: নিরাপত্তা সতর্কতা!!!