গাজীপুরের বিনিরাইলে জমজমাট মাছের মেলা

gazi-1-2201140539.jpg

ডেস্ক রিপোর্ট : পৌষ মাসের শেষ দিনে এবারো বিনিরাইলে জমজমাট মাছের মেলা বসেছে। গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বিনিরাইল এলাকার এই মেলাটি আড়াইশ বছরের পুরনো ঐতিহ্য বলে জানালেন স্থানীয়রা। এটি এ অঞ্চলের মানুষের কাছে শীতকালীন সবচেয়ে বড় উৎসব।

শুক্রবার (১৪ জানুয়ারি) সকালে সরেজমিনে উপজেলার জামালপুর, জাঙ্গালীয়া ও বক্তারপুর ইউনিয়নের ত্রি-মোহনায় বিনিরাইল এলাকায় ঐতিহ্যবাহী এই মাছের মেলায় গিয়ে দেখা যায় মাছ কেনাবেচার জমজমাট দৃশ্য। এ উপলক্ষে বসেছে অন্যান্য বস্ত্র, চারু-কারু, প্রসাধনী, ফার্নিচার, খেলনা, তৈজষপত্র, মিষ্টি ও কুটির শিল্পের নানা পণ্যেরও সহস্রাধিক স্টল।

আরও পড়ুন : নানকের বক্তব্যের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ঘুঘুর ফাঁদ দেখেছি: তৈমূর

দেখা গেছে, বিরাট এলাকাজুড়ে মাছের পসরা সাজিয়ে বসেছেন মাছ বিক্রেতারা। সহস্রাধিক স্টলে দেশের বিভিন্ন জায়গার মাছ বিক্রেতারা এখানে মাছ বিক্রির জন্য ছুটে আসেন। তারা নানা অঙ্গভঙ্গি করে সুর ধরে ডেকে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। কেউ কেউ বড় আকৃতির মাছ উপরে তুলে ধরে ক্রেতাদের ডাকছেন। আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন তো এসেছেনই। এর বাইরে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে অনেকে এসেছেন উপজেলার সর্ববৃহৎ এই মাছের মেলায়। গাজীপুর, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ভৈরব, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ থেকে অনেক মানুষ কেবল এই মেলা উপলক্ষেই কালীগঞ্জে এসেছেন।

প্রতি বছর অগ্রহায়ণের ধান কাটা শেষে পৌষ-সংক্রান্তিতে অনুষ্ঠিত হয় এ মেলা। তখন আয়োজন করা হয় নবান্ন উৎসবেরও। এবারের মেলায় প্রায় ৫ শতাধিক মাছ ব্যবসায়ী বাহারি মাছ নিয়ে এসেছেন। মেলায় মাছ ছাড়াও মাছের সঙ্গে এই মেলায় আসবাবপত্র, খেলনা, মিষ্টি, বস্ত্র, হস্ত ও কুটির শিল্পের নানা পণ্যেরও আমদানি হয়।মাছের মেলায় সামুদ্রিক চিতল, বাঘাইড়, আইড়, বোয়াল, কালী বাউশ, পাবদা, গুলসা, গলদা চিংড়ি, বাইম, কাইকলা, রূপচাঁদা মাছের পাশাপাশি স্থান পেয়েছে নানা রকমের দেশী মাছ।

মাছ নিয়ে মেলায় আসা এক ব্যবসায়ী জানান, তিনি ৪০ বছর ধরে এই মেলায় দোকান করেন। শুরুতে বেচা-কেনা ভালো হলেও বর্তমানে তেমন হয়না। কারণ কোন্দলের জন্য বিনিরাইলের মেলাটি দু’ই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। বিনিরাইলের পাশেই চুপাইর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বসে তিন দিনব্যাপী মাছের মেলা। তবে ঐতিহ্যের কারণে বিনিরাইলে কেনার চেয়ে দেখতে আসা মানুষের ভিড় বেশি।

মেলায় কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলা থেকে আসা মাছ ব্যবসায়া নয়ন কুমার দাস (৫০) জানান, মেলায় প্রচুর দেশি রুই, কাতল, বোয়াল, আইড়, বাঘাইড়, চিতল, কালবাউশ ও রিটা  মাছের সমাগম হয়েছে। এছাড়া কার্প জাতীয় নানা মাছের আমদানি হয়েছে। এক কেজি থেকে শুরু করে বিশ কেজি পর্যন্ত এসব মাছের দাম হাঁকা হচ্ছে ৪০০ টাকা থেকে শুরু করে ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। বিক্রিও হচ্ছে প্রচুর। সামর্থ অনুযায়ী ক্রেতারা এসব মাছ কিনছেন।

মেলায় মাছ কিনতে আসা বিনিরাইলের মাছের মেলা সংলগ্ন জামালপুর ইউনিয়নের কাপাইস গ্রামের জামাই মো. হোসেন আলী বলেন, শ্বশুরবাড়ীতে মাছ নিয়ে যাওয়া বলে কথা। তাই এলাকার সকল জামাইদের নজর বিনিরাইলের মাছের মেলার বড় মাছটার দিকেই। স্থানীয় বড় মাছ ব্যবসায়ীরা সপ্তাহখানেক ধরে বড় বড় মাছ সংগ্রহ করে থাকেন। সেই অনুযায়ী মাছের দামও হাঁকানো হয়। শুরুতে এ মেলা শুধুমাত্র হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য হলেও, বর্তমানে এটা সকল ধর্মের মানুষের কাছেই ঐতিহ্যর উৎসবে পরিনত।

কাপাসিয়া উপজেলার চানপুর গ্রামের মো. ফরহাদ মিয়া জানান, এবার সাড়ে ১৭ হাজার টাকার চিতল, বোয়াল, আইড়সহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ কিনেছেন বাড়ীতে নিয়ে যাওয়ার জন্য।জামালপুর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য নুরুল ইসলাম নুরু জানান, এই মেলাটি প্রথম অনুষ্ঠিত হতো খুবই ক্ষুদ্র পরিসরে এটি অগ্রহায়ণের ধান কাটা শেষে পৌষ-সংক্রান্তি ও নবান্ন উৎসবে আয়োজন করা হতো। প্রায় ২৫০ বছর যাবৎ মেলাটি আয়োজন হয়ে আসছেন এলাকার মুরুব্বিরা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ মেলাটি একটি সর্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে।

আরও পড়ুন : আলুর আকারের গ্রহ আবিষ্কার

মাছের মেলার আয়োজক কমিটির সভাপতি ও ইউপি সদস্য কিশোর আকন্দ জানান, বৃটিশ শাসনামল থেকে শুরু হওয়া বিনিরাইলের মাছের মেলা এখন ঐতিহ্যে রূপ নিয়েছে। এ মেলা কালীগঞ্জের সবচেয়ে বড় মাছের মেলা হিসেবে স্বীকৃত।তিনি বলেন, এখানে শুধু মাছ নয়, এ মেলাকে কেন্দ্র করে বস্ত্র, হস্তশিল্প, চারু-কারু, প্রসাধনী, ফার্নিচার, খেলনা, তৈজষপত্র, মিষ্টি ও কুটির শিল্পের নানা পণ্যের সহস্রাধিক স্টল বসে।

মেলাকে ঘিরে বিনিরাইলের পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে বিরাজ করে উৎসবের আমেজ। মেলা উপলক্ষে মেয়ে-জামাইকে দাওয়াত করে আনা এই এলাকার মানুষের রীতিতে পরিণত হয়েছে। জামালপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুর রহমান ফারুক মাস্টার জানান, বৃটিশ শাসনামল থেকে শুরু হওয়া বিনিরাইলের মাছের মেলা এখন ঐতিহ্যে রূপ নিয়েছে। মাছের মেলাটি এ অঞ্চলের মানুষের ঐতিহ্যের ধারক-বাহক।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top