পুলিশ হেফাজতে নির্মম নির্যাতনের অভিযোগ আ.লীগ নেতার

leader-258239.jpg

ডেস্ক রিপোর্ট : পুলিশ হেফাজত থেকে মুক্ত হয়ে ফিরলেও গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছেন যশোর শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহামুদ হাসান বিপু। তার অভিযোগ, পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে তাকে নির্মমভাবে প্রহার করা হয়। তিন দফা তাকে পেটানো হয়। এদিকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। অবশ্য পুলিশ সুপার দাবি করেছেন, পুলিশ হেফাজতে কোনো মারপিটের ঘটনা ঘটেনি।

সোমবার (১১ জানুয়ারি) রাত ৮টার দিকে শহরের পুরাতন কসবায় নতুন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় সাদা পোশাকে থাকা কয়েক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে তুচ্ছ ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গোলযোগ হয়। এ সময় নিজের পরিচয় দিয়ে ও পরিচয়পত্র দেখিয়ে পুলিশ কনস্টেবল ইমরান এর প্রতিবাদ করেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ কর্মীরা ক্ষ্যান্ত না হয়ে তাকে মারপিট করে এবং অপহরণ করে পাশের আবু নাসের স্মৃতি সংসদ ক্লাবে নিয়ে যায়। ওই ঘটনার সময় সেখানে শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হাসান বিপুও ছিলেন। সেখানে ফের মারপিট করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা শহীদ ইমরানকে উদ্ধার ও আওয়ামী লীগ নেতা মাহমুদ হাসান বিপুসহ চারজনকে হেফাজতে নেয়। প্রায় ১৯ ঘন্টা পর মঙ্গলবার (১২ জানুয়ারি) দুপুরের পর মাহমুদ হাসান বিপুকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর রাতেই গুরুতর অবস্থায় যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। মাহামুদ হাসান বিপুর অভিযোগ পুলিশ হেফাজতে নিয়ে তাকে নির্মমভাবে বেধড়ক মারপিট করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি আবু নাসের স্মৃতি সংসদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন শহর আওয়ামীল লীগের এক প্রবীণ নেতা এসে জানায়, শহীদ মিনারের সামনে মারামারি হচ্ছে পারলে ঠেকাও। আমি এগিয়ে গিয়ে দেখি একটি ছেলেকে কয়েকজন মিলে মারধর করছে। আমি গিয়ে ছেলেটাকে সেফ করি। অন্যদের বলি কেন মারছো, চলে যাও সব। ওরা বলে, আমাদের মেরেছে এ জন্য। পরে আমি তাদের চলে যেতে বলি। তখন দেখি আরো অনেকে দৌড়ে আসছে। তখন আমি ভাবি, ছেলেটাকে রক্ষা করতে হবে। এ সময় আমি একটি মোটারসাইকেল দাঁড় করিয়ে বলি ছেলেটাকে একটু কাঁঠালতলা অফিসে পৌঁছে দেন। ওই অফিসটা জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি শাহীন চাকলাদারের অফিস। আমি মনে করেছি, ওখানে পাঠালে কেউ ছেলেটাকে মারতে পারবে না এবং আমি ওসি সাহেবকে খবর দিয়ে ছেলেটাকে তাদের হাতে দিয়ে দেব। ওসি সাহেবকে ফোন দিতে দিতে পুলিশ চলে আসে। পুলিশকে বিষয়টি বর্ণনা করি। এরপর ওই ছেলেটাকে কাঁঠালতলা অফিস থেকে ফিরিয়ে এনে পুলিশের কাছে দিয়ে দেই।’

‘এরপর ওসি ঘটনাস্থলে আসে। তিনি এসে বলেন কে পুলিশের ওপর হাত দিয়েছে বলে জানতে চায়। তখন আমি জানলাম আক্রান্ত ছেলেটি পুলিশ। এরপর হঠাৎ আমার ঘাড়ে লাঠি দিয়ে আঘাত করে পুলিশ। আমি বললাম এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি করছেন। এরপর আমাকে ধরে থানায় ও পরে ডিবি অফিসে নিয়ে যায়। সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাব্বানী গালিগালাজ করে এবং অস্ত্র বের গুলি করবে বলে হুমকি দেয়। তখন আমি বললাম আমার গোষ্ঠীতে সাতজন মুক্তিযোদ্ধা, আমাদের পরিবারের সবাই আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত। আমি ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়ে আজকে শহর আওয়ামী লীগের নেতা। আমি কাউয়ালীগ বলবেন না। এরপর সাত-আটজন মিলে মৌমাছির মতো ২০-২৫ মিনিট ধরে নির্মমভাবে মারপিট করেছেন।’

বিপু আরও বলেন, ‘পরে আক্রান্ত পুলিশ সদস্যকে নিয়ে আসে। সে কর্মকর্তাদের সামনে জানায় আমি তাকে সেফ করেছি। এর আধা ঘণ্টা পর আবার আমার চোখ বেঁধে মারপিট করা হয়েছে। আমার কোনো অপরাধ ছিল না। আমি আওয়ামী লীগের কর্মী অথচ আমাকে চোরের মতো মারপিট করা হয়েছে। একপর্যায়ে আমি বললাম, আমার মাথায় বাড়ি মারেন। পরে ওরা চলে গেল। আমার চোখ বাঁধা, হাত পেছনে হ্যান্ডকাফ দিয়ে বাঁধা। পা দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। আধা ঘণ্টা পরে পানি খেতে চাইলে পানি দেয়। কিন্তু চোখ খোলেনি। রাত পৌনে ৩টার দিকে আবার একটি টিম এসে বলে পুলিশের গায় হাত দিস। আমি বললাম, পুলিশের হাবিলদার থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক। আমার সঙ্গে কারো কোনো দ্বন্দ্ব নেই। এরপর তারা বলে তোর বাহিনী মেরেছে। এরপর আবার মারপিট শুরু হয়। আমি বলি, আমি অপরাধ করেনি। তারপরও যদি আপনাদের মনে হয় তাহলে আমার মাথায় বাড়ি মেরে আমাকে মেরে ফেলেন। তবু এভাবে নির্যাতন করেন না। বিএনপি আমলে আমারে ধরে এনে মাত্র চারটি বাড়ি মারছিল আর আপনারা যা করছেন তার থেকে আমারে মেরে ফেলেন। আমি অপরাধ করিনি। আমি পুলিশ ভাইটিকে সেফ করেছি। এটাই আমার কাল হলো।’

এদিকে বিপুকে চিকিৎসা প্রদানকারী অর্থপেডিক সার্জন আব্দুর রউফ জানান, ‘বিপুর শরীরের একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এ ছাড়া তার ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে। তার সুস্থ হতে সময় লাগবে।’
জানতে চাইলে শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মাদ আসাদুজ্জামান জানান, ‘বিপুকে নির্মম নির্যাতন করে পুলিশ ক্ষ্যান্ত হয়নি। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সোমবার রাতে শহরের অনেক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত করে বিচার দাবি করেন তারা।’তিনি আরও জানান, ‘বিপুর অবস্থা খুবই গুরুতর। চিকিৎসকরা তাকে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছেন। এ জন্য আজ বুধবার দুপুরে তাকে হেলিকপ্টার যোগে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার কথা রয়েছে।’

অবশ্য পুলিশ সুপার মুহাম্মাদ আশরাফ হোসেন দাবি করেছেন, ‘পুলিশ সদস্য মারপিট ও আটকে রাখার ঘটনায় মামলা হয়েছে। এ অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের ধরতে ওই রাতে অভিযান চালানো হয়েছে। তবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা সত্য নয়। আমার জানা মতে, কোনো আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়নি। সিসিটিভির ফুটেজ আমি দেখেছি। সেখানে পুলিশের টিম কেবল যাচ্ছে। তারা বেআইনিভাবে ভাঙচুর করেছে এমন কোনো ছবি নেই। এমনকি পুলিশ হেফাজতে বিপুকে কোনো প্রকার মারপিটের ঘটনা ঘটেনি। উনি একজন সম্মানিত লোক, জিজ্ঞাসাবাদের কিছু নিয়ম আছে সেগুলো মেনেই আমরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। ওনাকে হেফাজতে মারার কোনো কারণ থাকতে পারে না। তারপরও অভিযোগ যেহেতু আসছে সে কারণে সিনিয়র কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে একটি তদন্ত টিম করে দেয়া হয়েছে। ফলে কোনো ব্যত্যয় হলে তা তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পরই বলা সম্ভব হবে।’

এদিকে, পুলিশ সদস্যকে মারপিটের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় বিপুর সঙ্গে আটক শাহিনুজ্জামান তপু ও ইমামুল হককে আসামি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: নিরাপত্তা সতর্কতা!!!