মাগুরায় ঐতিহ্যবাহী ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা আজ

Untitled-5-2201120701.jpg

মাগুরা প্রতিনিধি : মাগুরার মহম্মদপুরে শতবর্ষী মেলা ও গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। বুধবার উপজেলার বালিদিয়া ইউনিয়নের বড়রিয়া গ্রামে ১১৩ বছর ধরে এই মেলা ও ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জেলার সর্ববৃহৎ এ মেলা প্রতিবছর বাংলা পৌষ মাসের ২৮ তারিখে বসে।

প্রাচীন এ মেলা ঘিরে শুধু বড়রিয়া নয়, উৎসব, উন্মাদনা আর আনন্দে মাতে আশপাশের অন্তত ৫০ গ্রামের মানুষ। মূল আকর্ষণ ঘোড়দৌড়। আর মেলা তো আছেই। মাগুরা, ঝিনাইদহ, নড়াইল, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, সাতক্ষীরা, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা এ মেলায় দোকান বসিয়ে পণ্য বিক্রি করেন। চুড়ি-ফিতা থেকে শুরু করে মিষ্টি-মিঠাই, ঘর-গৃহস্থালির সব ধরনের পণ্য পাওয়া যায় এ মেলায়।

আরও পড়ুন : দিনাজপুরে অস্থির চালের বাজার

প্রায় এক বর্গমাইল এলাকা জুড়ে মেলা বসে। মূল মেলা একদিনের হলেও ১৫ দিন ধরে চলে মেলার উৎসব। মেলার পরদিন নারীরা মেলায় আসেন। এই দিনের মেলা ‘বউ মেলা’ নামেও পরিচিত।

চর বড়রিয়া গ্রামের বাসিন্দা শুকুর মোল্যা জানান, মেলা উপলক্ষ্যে জামাই-মেয়েদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। ঈদে না আসলেও মেলা উপলক্ষে জামাইদের শশুরালয়ে আসা বাধ্যতামূলক। জামাইরা মেলা থেকে বড় মাছ কিনে-শশুরালয়ে নেওয়ার রেওয়াজ বহু পুরোনো। জামাইদের রসনা তৃপ্তির জন্য শীতের নলেন খেজুর গুড় দিয়ে তৈরি হয় নানা পিঠাপুলি।

বুধবার (১২ জানুয়ারি) মহম্মদপুরে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই লোকজন ঘোড়দৌড় মাঠে আসতে শুরু করেছেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাঠে হাজারো মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়। ঘড়ির কাঁটায় সকাল ১১টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে মাঠে আসে ৯টি ঘোড়া। আগে থেকেই ঘোড়দৌড়ের নির্দিষ্ট বৃত্তাকৃতির পথে নিশান ওড়ানো হয়েছিল। প্রতিযোগী ঘোড়াদের নির্দিষ্ট পথে নিয়ে গিয়ে মহড়াও সেরে নেওয়া হয়।

দুপুর আড়াইটার পরপরই শুরু হবে প্রতিযোগিতা। ঘোড়সওয়ারের বাঁশির আওয়াজে ঘোড়া ছুটে চলবে দুর্বার গতিতে। হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন রাস্তা ও বিলের বিশাল প্রান্তরে দাঁড়িয়ে আপন মনে উপভোগ করবেন ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা।

স্থানীয় লোকজন জানান, অর্থ-সম্পদ আর লাঠির জোর ছিল বড়রিয়ার সরদারদের। বাহুশক্তিও কম ছিল না সরদার বংশের ছেলেদের। কথিত আছে, হাত দিয়ে পিষে সরষের তেল বের করতে পারতেন এই বংশের ছেলে আবদুস সামাদ সরদার। তাঁর মতোই শক্তিশালী ছিল তাঁর এক ঘোড়া। যে ঘোড়ায় চড়ে তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন। আত্মীয়স্বজনের বাড়ি থেকে শুরু করে সব জায়গায় যেতেন ঘোড়ায় চড়ে। আশপাশে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার খবর পেলে ছুটে যেতেন সামাদ সরদার।

গ্রামবাসীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যমতে, আনুমানিক ১১৩ বছর আগে এমনই এক প্রতিযোগিতায় গিয়েছিলেন সামাদ। মাগুরা সদর উপজেলার বাখরবা নামের ওই গ্রামে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন। তিন দফা প্রথম হবার পরও তাঁকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়নি। তাঁকে হারাতেই একাধিকবার ঘোড়া দাবড়ানো হয়। শেষে ক্ষিপ্ত হয়ে বাড়ি ফেরেন সামাদ সরদার।

সালটি কারও মনে না থাকলেও পরদিন ছিল ১১ জানুয়ারি। বাড়িতে এসেই নিজ জমিতে আয়োজন করেন ঘোড়দৌড়ের আসর। সেই থেকে মাগুরা জেলার মহম্মদপুরের সরদারদের আয়োজনে চলে আসছে ঘোড়দৌড়। আর এই ঘোড়দৌড় ঘিরে গ্রামে বসে মেলা।

আরও পড়ুন : ৩২ বছর ধরে চালান ঘোড়ার গাড়ি, ভালো আছেন মতিন

মেলা কমিটির বর্তমান সম্পাদক শাহজাহান সরদার জানান, তাঁর দাদার বাবা আবদুস সামাদ সরদার টানা ৩৫ বছর এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। তিনি মারা গেলে দায়িত্ব পড়ে আজিজার রহমান সরদারের ওপর। তিনিও ২৫ বছর এই আয়োজন করেছেন। আজিজার রহমানের মৃত্যুর পর দায়িত্ব পান কালাম সরদার। এই কালাম সরদার ২০ বছর এই আয়োজন করেছেন। এরপর ১৯৯৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ঘোড়দৌড় ও মেলার আয়োজন করে আসছেন তিনি।

প্রতি বছর পৌষ মাসের ২৮ তারিখ এই প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে। স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে অনুমোদন নেওয়া হয়। এবারও তা–ই হয়েছে।মেলা কমিটির সভাপতি আবুল কালাম ফকির বলেন, ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা উপলক্ষে আয়োজিত মেলায় চার হাজারের বেশি দোকান বসেছে। আগে আরও বেশি দোকান বসত। ৪০ থেকে ৫০টি ঘোড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিত। এখন আর মানুষ তেমন ঘোড়া পালন করে না। তবে এই ঘোড়দৌড় ও মেলা এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করে। তাই ১১৩ বছর ধরে টিকে আছে এই মেলা।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top