কমলা চাষ করে বদলে গেছে দুই ভাইয়ের জীবন

orange-20230112135316.jpg

ডেস্ক রিপোর্ট : সমতল ভূমিতে সুমিষ্ট চায়না কমলার চাষাবাদে বাজিমাত করেছেন বগুড়ার দুই সহোদর সাহিদ পারভেজ ও সাফিকুর রহমান পল্লব। তাদের বাগানে গাছে গাছে দোল খাচ্ছে সবুজ-কমলা রঙের চায়না কমলা। বাজারে এই কমলার দাম এবং চাহিদা ভালো থাকায় আগামী বছর থেকে তারা বাণিজ্যিকভাবে কমলা বাজারজাত করবেন বলে জানিয়েছেন।

এদিকে তাদের সফলতা দেখে অনেকেই কমলা চাষের স্বপ্ন দেখছেন। কমলা বাগান দেখতে প্রতিদিন অনেক নতুন উদ্যোক্তা আসছেন। ভিড় করছেন অনেক দর্শনার্থীও।

বগুড়া শহর থেকে ৮ কিলোমিটার উত্তরে সদর উপজেলার লাহিড়ীপাড়া ইউনিয়নের কাজী নূরইল এলাকায় ২ বিঘা জমিতে এই বাগান করেছেন পারভেজ ও পল্লব। নিজেরা কিছু করার লক্ষ্যে ২০১৯ সালে চুয়াডাঙ্গায় এক কৃষকের চায়না কমলার বাগান দেখতে যান। সেখান থেকে তারা কমলা চাষাবাদে আগ্রহী হয়ে উঠেন। পরবর্তীতে সেখান থেকে দুই মাস বয়সী ২১৪টি কমলার চারা নিয়ে আসেন। নিজেদের ২ বিঘা জমিতে ‘সাহিদা এগ্রো ফার্ম’ নামে একটি চায়না কমলার বাগান করেন। এর মধ্যে চারটি চারা মারা যায়। বাকি ২১০টি চারায় ২ বছর পরই ফল ধরা শুরু করে। ভালো ফলাফলের জন্য ও পরীক্ষার জন্য ৬০ শতাংশ গাছের ফল রেখে বাকি ফল ফেলে দেন। বর্তমানে কোনো গাছ বুক সমান, কোনটা আবার ৫/৬ ফুট ছাড়িয়েছে। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে নজরকাড়া ছোট ছোট কমলা। এরই মধ্যে অনেক ফলেই পাকা রঙ ধরেছে। এসব কমলা চাষাবাদ দেখতে আশপাশের লোকসহ দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন অনেকেই।

বাগান রাস্তার পাশে হওয়ায় অনেকেই গাড়ি থামিয়ে বাগান দেখছেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখলে মনে হবে গাছে বড় জাতের কোনো বরই ধরে আছে। কিন্তু গাছের কাছে গেলে দেখা যায়, কোথাও সবুজ আবার কোথাও টকটকে কমলা রঙের চায়না জাতের কমলা দুলছে। এ জাতের কমলা আকারে কিছুটা ছোট হলেও খুব সুমিষ্ট। তাই বাজারে এ জাতের কমলার দাম ও চাহিদা ভালো। দুই ভাইয়ের কমলা চাষের সাফল্য দেখে পার্শ্ববর্তী গোকুল ইউনিয়নের পলাশবাড়ী দক্ষিণপাড়া গ্রামের কমলা চাষি আজিজুর রহমান ও মাহমুদ বাবুল তাদের বাগানে এই ফলটির চাষাবাদ করছেন। ফলনও হয়েছে বেশ ভালো।

অন্যদিকে, কমলা চাষ করে ভাগ্য ফেরাতে চান বগুড়া পৌর এলাকার ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের গোবরধনপুর গ্রামের ফনির মোড়ের আব্দুল আজিজ প্রামাণিক। পোল্যান্ডে চাকরিরত সফটওয়্যার প্রকৌশলী সন্তানের ইচ্ছায় কমলা চাষ শুরু করেন দুই বছর আগে। সন্তান বিদেশে চাকরিতে চলে গেলে তিনি সন্তানের স্বপ্ন পূরণ করতে কমলা চাষের হাল ছাড়েননি।

কাজী নুরুইল গ্রামের কমলা চাষি সাফিকুর রহমান পল্লব বলেন, আমি একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করতাম। সেখান থেকে ২০১৯ সালে চলে আসার পর আমি আর আমার বড় ভাই সাহিদ পারভেজ এই কমলার বাগান করেছি। গতানুগতিক যেসব ফসল হয় সেখান থেকে বের হয়ে আমরা নতুন একটি ফল নিয়ে চেষ্টা করেছি। আসলে এটা আমাদের জন্য খুবই ঝুঁকির ব্যাপার ছিল। এতদিন ধরে বাগান তৈরি করা, ফল কেমন আসবে। তবে এটা আমাদের পৈতৃক জমি হওয়ায় কিছুটা সহজ হয়েছে। অনেকের জন্যই হয়তো একটু কঠিন হবে। তবে এখন যেহেতু পরীক্ষিত সে কারণে যে কেউ এটাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, এই ফল আসলে সিলেট ও চট্রগ্রাম এবং ভারতের দার্জিলিংয়ে হয়। সেই ফল আমরা সমতল ভূমিতে চাষ করার চেষ্টা করেছি এবং সফল হয়েছি। দুই বিঘা জমিতে ২০০ গাছ লাগিয়েছি। যদি প্রতি গাছ থেকে ১৫/১৬ কেজি কমলা পায় তাহলে ৩ হাজার কেজি কমলা পাব। আর তা বিক্রি করে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকার মতো আয় করা সম্ভব। এছাড়া এ মৌসুমে ১০ হাজার গাছের চারা তৈরি করেছি। গাছের চারা বিক্রিতেও ব্যাপক সাড়া পেয়েছি।

আরও পড়ুন : ফের পেছাল পাপিয়া দম্পতির বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ

পল্লবের বড় ভাই সাহিদ পারভেজ বলেন, ভালো জাত নির্বাচন করতে হবে, আর কিছু রোগবালাই আছে। ভালোভাবে পরিচর্যা করলে সহজেই কমলা চাষাবাদ করা যায়। কমলা চাষাবাদে এখন পর্যন্ত যা দেখছি তাতে আশা জাগছে। বগুড়ার মাটিও কমলা চাষের জন্য ভালো।

নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্যে সফল এই চাষি বলেন, কেবল পাহাড় নয়, সঠিক পরিচর্যা করে সমতল জমিতেও সুমিষ্ট কমলার চাষ সম্ভব। বিদেশ থেকে কমলা আমদানির দিন শেষ হতে চলেছে। বাণিজ্যিকভাবে বাগান বাড়লে দেশীয় কমলা দিয়ে বাৎসরিক চাহিদা মেটানো সম্ভব।

এ বিষয়ে বগুড়া সদর উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মাহফুজ আনাম বলেন, বগুড়া সদর উপজেলায় প্রায় ১০ হেক্টর জমিতে মাল্টা ও কমলার চাষাবাদ হচ্ছে। এই উপজেলায় ছোটবড় অনেক কমলার বাগান রয়েছে। তবে প্রসিদ্ধ বাগান রয়েছে কয়েকটি। এর মধ্যে কাজী নুরুইল গ্রামে একটি, লাহিড়ীপাড়ায় একটি, গোকুলে একটি এবং পৌরসভার ১৯নং ওয়ার্ডে আজিজ সাহেবের একটি বাগান রয়েছে। বগুড়া সদর উপজেলার মাটি কমলা চাষের জন্য উপযোগী। এখানে আমাদের যে কমলা চাষ হচ্ছে সেগুলো অত্যন্ত সুমিষ্ট এবং বাজারে এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। তাই সকলকে অনুরোধ করবো কমলা চাষাবাদ করুন এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হোন।

তিনি আরও বলেন, কমলা ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ একটি ফল। এটি খেলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। তাই কৃষক পর্যায়ে উৎপাদিত কমলা যদি আমরা সরাসরি কিনে খেতে পারি তাহলে কৃষকরা সরাসরি লাভবান হবে এবং আরও উৎসাহিত হবে।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top