বিমানবন্দরে বাসি-পচা খাবার খেয়ে কলেরা আক্রান্ত রেমিট্যান্সযোদ্ধারা

005731Shahjalal-Airport_kalerkant.jpg

ডেস্ক রিপোর্ট : নারায়ণগঞ্জের বন্দর থেকে বিমানবন্দরে সকালে এসেছিলেন মো. লিটন। বৃহস্পতিবার (৬ জানুয়ারি) আমিরাতগামী এই যাত্রীর ফ্লাইট রাত ৯টা ২০ মিনিটে। তিনি দুপুরে বিমানবন্দরের বহুতল কার পার্কিং ভবনের ছাদে বসে বাসা থেকে আনা খিচুড়ি খাচ্ছিলেন।

লিটন বলেন, আমিরাতে যেতে হলে বিমানবন্দরে করোনা পরীক্ষা লাগে। এ জন্য এত আগে বিমানবন্দরে এসেছি। খাবারটা একটু গন্ধ লাগছে। বিমানবন্দরের ভেতরে খাবারের অনেক দাম। এ কারণে গন্ধ খাবার খেয়ে ফেলেছি। খবরে দেখলাম শ্রমিকরা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আমি ভোরে বাসা থেকে বের হয়েছি, রাতে ফ্লাইট, পৌঁছাব কাল। এই দুদিনে শরীর ক্লান্ত হয়ে যাবে। তাই উপায় না দেখে বাধ্য হয়ে খাচ্ছি।

লিটনের মতো ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দুই দেশ কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যাওয়ার পর সম্প্রতি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ১৮০ বাংলাদেশি শ্রমিক। তাদের মধ্যে কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েন উড়োজাহাজের মধ্যেই।

উভয় দেশের চিকিৎসকরাই জানিয়েছেন, এসব শ্রমিক পানিবাহিত রোগ কলেরায় ভুগছেন, যা ভাবিয়ে তুলেছে জনশক্তি রপ্তানিতে জড়িত সংশ্লিষ্টদের। তাদের ধারণা, ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ ও বাইরের হোটেলগুলোতে খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন এসব বিদেশগামী শ্রমিক। তবে শাহজালাল কর্তৃপক্ষের দাবি, বিমানবন্দরের ভেতরে পচা-বাসি খাবার বিক্রি হচ্ছে না। ভেতরে খাবারের দোকানগুলো নিয়মিত তদারকি করা হয়। বাইরে থেকেও খাবার বিমানবন্দরের ভেতরে আনতে দেওয়া হয় না। অন্য কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন যাত্রীরা।

আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের জন্য প্রায় ৬ ঘণ্টা আগে বিমানবন্দরে আসতে হয় প্রবাসীকর্মীদের। আর মধ্যপ্রাচ্যের সংযুক্ত আরব আমিরাতগামী যাত্রীদের আসতে হয় অন্তত ৮ ঘণ্টা আগে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসে একটা লম্বা সময় প্রবাসীকর্মীদের কাটাতে হয় বিমানবন্দরেই। এ সময়ে তারা বিমানবন্দর ও আশপাশের দোকান ও ক্যান্টিন থেকে খাবার ও পানি কিনে যেমন খান, আবার অনেকেই খান বাড়ি থেকে সঙ্গে নিয়ে আসা খাবার। অনেকে খরচ বাঁচাতে না খেয়েও থাকেন। দীর্ঘসময় অভুক্ত থাকা, অস্বাস্থ্যকর খাবার ও পানি গ্রহণ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম না নেওয়ায় অনেকেই সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বিদেশে গিয়ে যাত্রীরা অসুস্থ হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছি। তবে এটি খুব বড় আকারের নয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১২০ জন ও কাতারে ৬০ জন অসুস্থ হওয়ার কথা জানা গেছে।

আরও পড়ুন : ফেনীতে কোর্ট পরিদর্শকের হাতে আইনজীবী লাঞ্ছিত 

এরই মধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে বাংলাদেশিদের সেদেশে কলেরায় আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।

চিঠি পেয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় বসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বৈঠকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন, বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট ১৬টি সংস্থার প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

সভায় সিদ্ধান্ত হয়—বাংলাদেশি বিদেশযাত্রীদের মাঝে কলেরা ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার রোধে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হবে। বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকার রেস্তোরাঁগুলোতে পানি ও খাবারের মান যাচাই করতে বিভিন্ন সংস্থা চালাবে অভিযান।

তবে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, নিম্নমানের কোনো খাবার বিমানবন্দরের ভেতরে বিক্রি হচ্ছে না। নিয়মিত তদারকি করা হয় বিমানবন্দরের খাবারের দোকানগুলোতে। বিমানবন্দরের বহুতল কার পার্কিংয়ের দোতলায় করোনা পরীক্ষাগারের স্থানে যাত্রীদের সুবিধার জন্য চারটি খাবারের দোকান আছে, সেখানে খাবারও মানসম্মত।

হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ এইচ এম তৌহিদ-উল আহসান বলেন, বিমানবন্দরের ভেতরে যেসব রেস্তোরাঁ আছে, সেগুলো আমরা নিয়মিত চেক করছি। স্যানিটারি ইনস্পেক্টরের আলাদা শাখা আছে এগুলো দেখভালের জন্য। পাশাপাশি করোনার পিসিআর পরীক্ষাগারে যে চারটি খাবারের দোকান আছে—সেগুলোও তদারকির মধ্যে আছে। এই সব রেস্তোরাঁতে কোনো পচা–বাসি খাবার খাওয়ানো হয় না।

বিমানবন্দর এলাকায় খাবারের দাম একটু বেশি থাকায় অনেক সময় দূর–দূরান্ত থেকে যাত্রীরা নিজেরাই খাবার নিয়ে আসে। সেই খাবার আট ঘণ্টা পর বা এক দিন পর ঠিক নাও থাকতে পারে। অথচ যাত্রীরা সেগুলো খাচ্ছেন। বিমানবন্দরের আশপাশের রেস্তোরাঁ, সড়কের পাশের দোকান ও রেলস্টেশনে যাত্রীরা বিভিন্ন খাবার খাচ্ছেন। এই খাবারগুলোর গুণগত মানের কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই বিমানবন্দরের ভেতরে বাইরের খাবার নিতে দেওয়া হচ্ছে না।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top