বঙ্গবন্ধুর আদর্শে নিজেদের গড়তে হবে

image-380812-1609792387.jpg

ডেস্ক রিপোর্ট :  জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ত্যাগের আদর্শে নিজেদের গড়ে তোলার জন্য ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, সততা, নিষ্ঠা ও লক্ষ্য স্থির রেখে যারা আদর্শবান হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে পারবে, তারাই বড় হবে, দেশকে কিছু দিতে পারবে।আর যারা ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সার দিকে তাকাবে তারা হয়তো ভোগ করতে পারবে; কিন্তু দেশ ও জনগণকে কিছু দিতে পারবে না, নিজেরাও বড় হতে পারবে না। জ্ঞান ও শিক্ষাই সবচেয়ে বড় সম্পদ, কেউ কোনোদিন তা কেড়ে নিতে পারে না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারণ করে সেভাবেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নিজেদের গড়ে তুলতে হবে।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৭৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে সোমবার বিকালে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আলোচনাসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভার্চুয়ালি যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দেশের একটি মানুষ গৃহহীন থাকবে না, প্রত্যেক ঘরে আমরা আলো জ্বালব। বিজয়ী জাতি হিসেবে বাঙালি বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে চলবে। দেশ সবদিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে। ইনশাআল্লাহ আমরা বাংলাদেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলব। পঁচাত্তর-পরবর্তী হত্যা-ক্যু ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি এবং ক্ষমতাকে নিষ্কণ্টক করতে অস্ত্র-অর্থ দিয়ে ছাত্রদের বিপথে চালিত করার জন্য প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমালোচনা করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে জিয়াউর রহমান খুনি, স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী, একাত্তরের গণহত্যাকারীদের পুনর্বাসিত করে। তাদেরকে ক্ষমতার ভাগ দেয়। ওরা ক্ষমতাকে নিষ্কণ্টক করতেই ব্যস্ত ছিল। দেশের জন্য কোনো কিছু করার ইচ্ছাও তাদের ছিল না। বরং তাদের প্রধান লক্ষ্যই ছিল বাংলাদেশকে ব্যর্থ করার। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নস্যাৎ করে দিতে চেয়েছিল তারা। সেই ষড়যন্ত্র এখনো চলছে। ষড়যন্ত্র থেমে গেছে, এটা একদম ঠিক না। আর যে আদর্শ নিয়ে বাংলাদেশ গড়ে উঠেছিল জিয়াউর রহমান, সেই আদর্শকেই ধ্বংস করতে চেয়েছিল।

মাতৃভাষা থেকে স্বাধীনতা এবং পরবর্তী প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রলীগের অগ্রণী ভূমিকার কথা তুলে ধরেন সংগঠনটির সাবেক নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, কোনোকিছু অর্জন করতে হলে এবং যেকোনো আন্দোলন সফল করতে হলে শক্তিশালী সংগঠন দরকার। আর এ কারণেই ১৯৬৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ গ্রহণ করেছিলেন। আমিও সংগঠনকে শক্তিশালী করার কাজে বেশি মনোযোগ দিয়েছি।প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সারা বিশ্ব বাংলাদেশকে এখন ভিন্নভাবে দেখে। যারা এক সময় বলত, বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও কিছুই করতে পারবে না, বাংলাদেশ হবে তলাবিহীন ঝুড়ি; তারাই এখন বাংলাদেশকে ভিন্ন চোখে দেখে। বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেলের স্বীকৃতি দেয়। বাংলাদেশ সবদিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে। করোনার কারণে হয়তো আমরা একটু থমকে গেছি। কিন্তু এরমধ্যেও আমরা দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। তবে করোনার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করা হচ্ছে। আমাদের দেশে যেন দুর্ভিক্ষের ছায়া না পড়তে পারে সে জন্য কৃষি উৎপাদনের চাকাকে সচল রাখতে হবে, দেশের এক ইঞ্চি মাটিও যেন অনাবাদি না থাকে, সেদিকে সবাইকে লক্ষ রাখতে হবে।

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিভিন্ন ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে বলেন, করোনাভাইরাসের সময় আক্রান্ত রোগী এবং যারা মৃত্যুবরণ করেছে তাদের পাশে দাঁড়ানো, ঘরে ঘরে খাদ্য পৌঁছে দেওয়া, যখন ঝড় (আম্পান) এলো সেই ঝড়ের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো-এই কাজ করেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। আর এগুলোই হচ্ছে বড় কাজ।ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আদর্শবান নেতা হিসেবে নিজেদের গড়তে হবে। আগামী দিনে দেশটাকে তোমরা এগিয়ে নিতে যেতে পার। তিনি আরও বলেন, ছাত্রলীগের বয়স ৭৩, আমার ৭৫। আমিও পঁচাত্তরে পা দিয়েছি। কাজেই আমরা আর কতদিন চলব! কিন্তু তোমাদেরকে তো সামনে নেতৃত্ব দিতে হবে। সেভাবে তোমরা নিজেকে গড়ে তুলবে।

নিজের স্মৃতিচারণা করে শেখ হাসিনা বলেন, অনেক ইতিহাস অনেক স্মৃতি মনে পড়ে। আমি ছাত্রলীগের কোনো বড় নেতা ছিলাম না। ছোট্ট-খাট্ট নেতা, তাও (মূল নেতা তথা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক) না। আমি একজন কর্মী ছিলাম। সার্বক্ষণিক কর্মী। স্কুল জীবনে বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে গিয়ে সংগঠন করে এসেছি, কলেজজীবনে কলেজে গিয়ে গিয়ে সংগঠন করেছি। সেই ’৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন থেকেই শুরু করেছি মিছিলে যাওয়া। তখন থেকেই মিছিলে গেছি। তারপর কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলাম। কখনো আমরা কিছু হওয়ার কথা চিন্তা করিনি। আমার ভাই কামাল, সে-ও সব সময় এর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল। সব সময় একজন কর্মী হিসেবেই আমরা কাজ করেছি। এত বড় দায়িত্ব নিতে হবে এটা আমাদের স্বপ্নেও ছিল না। দুর্ভাগ্য যে ১৯৭৫ সালে সব হারালাম। যা হোক, এখন বাংলাদেশের মানুষের সেবা করতে পারছি। দেশের মানুষের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

শেখ হাসিনা বলেন, ২০২০ পার হয়ে ২০২১-এ এসেছি। এটা হচ্ছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছর। কাজেই মুজিববর্ষ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করব। যাদের গৃহ নাই, তাদেরকে ঘর করে দিচ্ছি। তোমাদের কাছে অনুরোধ থাকবে, তোমরা নিজ নিজ এলাকায় খোঁজ কর, কোন মানুষটা গৃহহীন আছে। সেই মানুষটা পেলে অবশ্যই আমাকে খবর দেবে এবং স্থানীয়ভাবে খবর দেবে। তাকে আমরা বিনা পয়সায় ঘর করে দেব। প্রত্যেকের ঘরে বিদ্যুৎ দেব। ইতোমধ্যে ৯৯ ভাগ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ দিয়েছি।প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি ছাত্রলীগের হাতে খাতা-কলম তুলে দিয়েছিলাম। আর বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া বলেছিলেন, আওয়ামী লীগকে শায়েস্তা করতে নাকি তার ছাত্রদলই যথেষ্ট। শুধু খালেদা জিয়া নন, জিয়াউর রহমানও ছাত্রদের হাতে অস্ত্র-অর্থ-মাদক তুলে দিয়ে বিপথে চালিত করেছিল। ’৭৫-পরবর্তী অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের পর শুধু সামরিক বাহিনী নয়, আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। অনেকের লাশও পাওয়া যায়নি। ওই সময় অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী জিয়ারা ছাত্রলীগকে নিজেদের কাছে টানার চেষ্টা করেছে, যাদের পারেনি তাদেরকে নির্যাতন করে হত্যা করেছে, লাশ গুম করে দিয়েছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলেছিলাম বলেই ভার্চুয়ালি এ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারছি। করোনাকালেও তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা দেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। তিনি বলেন, ২০০৯ সালের নির্বাচনি ইশতাহারে আমরা যখন ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন অনেকেই এ নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। এখন তারা কোথায়? তারাও তো এখন এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, অনেক কথা বলছে। আমরা ইউনিয়ন পর্যন্ত তথ্যপ্রযুক্তি সেবা পৌঁছে দিয়েছি, নিজস্ব স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ উৎক্ষেপণ করেছি। সবদিক থেকে বাংলাদেশ আজ এগিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমান সরকার শিক্ষাকে সব থেকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি জেলায় আমরা বিশ্ববিদ্যালয় করে দিচ্ছি। এ পর্যন্ত নতুন ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা হয়েছে। অনেকগুলোর কাজ চলমান। আবার বেসরকারি খাতে যারা বিশ্ববিদ্যালয় করতে চাচ্ছে তাদেরও সুযোগ করে দিচ্ছি। কারণ, বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে আমরা পিছিয়ে থাকতে পারি না। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের চলতে হবে।তিনি বলেন, আমরা শিক্ষাকে সব থেকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। যেহেতু করোনাভাইরাসের কারণে সব স্কুল-কলেজ বন্ধ, আমরা চালু করতে পারছি না। যখনই চালু করতে যাচ্ছি আবার দ্বিতীয় ঢেউ চলে আসছে। সেজন্য করতে পারলাম না। তারপরও আমার ঘর আমার বিদ্যালয় ব্যবহার করে তার মাধ্যমে শিক্ষার ব্যবস্থা করে যাচ্ছি। ছাত্রদের বলব বসে না থেকে পড়াশোনা কর। পাঠ্যপুস্তক তো আছেই, তা ছাড়াও পড়ার অনেক সুযোগ আছে। জ্ঞান যত বেশি অর্জন করতে পার ততই নিজেকে সম্পদশালী মনে করবে। ধন-সম্পদ কোনোদিন কাজে লাগে না। করোনাভাইরাস একটা জিনিস শিক্ষা দিয়ে গেছে যে, যার যতই টাকা-পয়সা থাকুক, যার যতই অর্থ সম্পদ বাড়ি গাড়ি থাকুক না কেন, সেগুলো একেবারেই ব্যর্থ।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে সাবেক ও বর্তমান নেতাকর্মীদের প্রতি শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান সাংগঠনিক অভিভাবক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়ের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের সঞ্চালনায় আলোচনাসভায় আরও বক্তব্য দেন ’৭৫-পরবর্তী দুঃসময়ে ছাত্রলীগের সভাপতি ও বর্তমানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন এবং আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক। এ সময় মঞ্চে সংগঠনটির সাবেক নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় ছাত্রলীগের দীর্ঘ ৭৩ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের একটি ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী ভার্চুয়ালি ছাত্রলীগের রক্তদান কর্মসূচিরও উদ্বোধন করেন।

ফেসবুকের সাথে কমেন্ট করুন

Share this post

PinIt

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top